ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র–ক্ষমতা নস্যাৎ দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, হামলার রহস্য কী?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পরিচালনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ভেঙে পড়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, তেহরানের সামরিক শক্তি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়নি; বরং পরিবর্তিত কৌশলে তারা এখনো কার্যকর হামলা চালাতে সক্ষম।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার পর থেকে ইরানের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক আঘাত হানা হচ্ছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ও নৌ সক্ষমতা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং আকাশপথে তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে ড্রোন উৎপাদন ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

তবে বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। যুদ্ধের শুরুতে ইরান ব্যাপক আকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

নিচের সারণিতে সংঘাতের শুরু ও পরবর্তী সময়ের হামলার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো—

সময়কাল ক্ষেপণাস্ত্র সংখ্যা ড্রোন সংখ্যা
প্রথম ২৪ ঘণ্টা ১৬৭টি ৫৪১টি
১৫তম দিন ৪টি ৬টি

এ ছাড়া পেন্টাগনের তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রায় ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা ৮৬ শতাংশ কমেছে।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—এই পতনের মধ্যেও ইরান কীভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত পরিবর্তন। ইরান এখন আর একসঙ্গে বড় আকারের হামলা চালাচ্ছে না; বরং ছোট আকারে, ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখছে। এই কৌশলকে অনেকেই “হয়রানিমূলক যুদ্ধনীতি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর লক্ষ্য সামরিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি এবং প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে তোলা।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর একটি বড় অংশ ধ্বংস হলেও দেশটি তার ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীভূত করেছে। স্থির লঞ্চারের পরিবর্তে মোবাইল লঞ্চার ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে, যা শনাক্ত করা কঠিন। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ৪১০ থেকে ৪৪০টি লঞ্চারের মধ্যে প্রায় ২৯০টি অচল করা হলেও বাকি অংশ দিয়েই তারা সীমিত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি—বিশেষ করে শাহেদ-১৩৬—তাদের কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কম খরচে দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এসব ড্রোন একসঙ্গে বহু সংখ্যায় ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব। যদিও এদের গতি তুলনামূলক কম, তবুও অনেক ক্ষেত্রে এগুলো প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক ছোট আকারের হামলা, যেমন দুবাই বিমানবন্দরের কাছে অগ্নিকাণ্ড বা শিল্প এলাকায় ড্রোন হামলা, এই নতুন কৌশলেরই প্রতিফলন। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব ফেলছে ইরান।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান এখন দীর্ঘস্থায়ী ‘ধৈর্যের যুদ্ধ’ চালাচ্ছে—যেখানে লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষয় করা। সামরিক শক্তি কমে গেলেও, এই বিকল্প কৌশলই ইরানকে এখনো আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে ধরে রেখেছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।