দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ায় বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন ডলারের মান সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা চলতি বছরের জানুয়ারির পর সবচেয়ে বড় পতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে চীনা ইউয়ানসহ ইউরোপীয় ও অন্যান্য প্রধান মুদ্রা শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে এসেছে, ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে নতুন গতিশীলতা তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বদলে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি বজায় থাকায় অনেকেই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প মুদ্রার দিকে ঝুঁকছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে।
গত সপ্তাহজুড়ে ডলারের সূচক প্রায় এক দশমিক তিন শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড এবং পণ্যনির্ভর অন্যান্য মুদ্রার মান ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে চীনা ইউয়ান নাটকীয়ভাবে শক্তিশালী হয়ে ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে, যা অর্থনীতিবিদদের জন্যও বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীন বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মুদ্রার এই শক্তিশালী অবস্থানকে বিশ্লেষকরা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্য প্রবাহ পুনর্গঠনের ফল হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ডলার থেকে ঝুঁকি কমিয়ে এশীয় মুদ্রার দিকে ঝুঁকছেন বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেছেন, ইরান ও পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করতে পারে, তবুও বিশ্ব অর্থনীতি পূর্বের অবস্থায় দ্রুত ফিরে যাওয়া কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন বৈশ্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই অস্থিরতার কারণে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় তিন দশমিক এক শতাংশে নেমে আসতে পারে।
নিচে সাম্প্রতিক মুদ্রাবাজারের প্রধান পরিবর্তনগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| মুদ্রা/সূচক |
পরিবর্তনের দিক |
সাম্প্রতিক অবস্থা |
| মার্কিন ডলার |
পতন |
প্রায় এক দশমিক তিন শতাংশ হ্রাস |
| চীনা ইউয়ান |
উত্থান |
২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থান |
| ইউরো |
উত্থান |
ধারাবাহিক শক্তিশালী প্রবণতা |
| ব্রিটিশ পাউন্ড |
উত্থান |
ধীরে ধীরে মান বৃদ্ধি |
| বৈশ্বিক মুদ্রাবাজার |
অস্থিরতা কমছে |
আস্থা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত |
বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি আলোচনা সফলভাবে অগ্রসর হয়, তবে আগামী কয়েক মাসে বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে আরও স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর না হলে এই স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে এখনও সংশয় রয়ে গেছে।
মন্তব্য