রানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনার অচলাবস্থার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ইরানের তেল রপ্তানি আয় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এখানে কোনো ধরনের সামরিক বা কূটনৈতিক বাধা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিতকরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ছাড় আশা করেছিল। তবে ইরান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। এর পরপরই ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ মার্কিন ডলারের আশেপাশে ছিল, সেখানে সংঘাতের পর তা বেড়ে ১০২ ডলারে পৌঁছায়। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে ৪০ দিনের মাথায় একতরফাভাবে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন ট্রাম্প। ইরানও এতে সম্মতি জানায়। তবে এরপর পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ কার্যকরের ঘোষণা আসে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই অবরোধ বাংলাদেশ সময় গতকাল রাত থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করাই এই অবরোধের মূল লক্ষ্য। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের তেল রপ্তানি আয়ে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটির অর্থনীতিকে কিছুটা শক্তিশালী করেছে। তবে এই নতুন অবরোধ সেই প্রবাহে বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে।
তবে এই কৌশলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়বে, যা ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ৩০ দিনের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিচে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| ক্ষেত্র | সম্ভাব্য ঝুঁকি |
|---|---|
| বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার | তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি |
| মার্কিন অর্থনীতি | মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি |
| চীন-মার্কিন সম্পর্ক | কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি |
| ইউরোপ ও জাপান | জ্বালানি সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি |
| সামরিক পরিস্থিতি | সংঘাত ও হতাহতের ঝুঁকি বৃদ্ধি |
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে জাতিসংঘ সতর্ক করেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, হরমুজে অবরোধ কার্যকর হলে সেখানে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ পাবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সামরিক সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে, যা মার্কিন বাহিনীর জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
এছাড়া চীনের জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। আগামী মাসে দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের আগে এমন পরিস্থিতি কূটনৈতিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন অবস্থান শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।



