শ্রীলঙ্কায় বীমা খাতে দ্বিগুণ প্রবেশের লক্ষ্য ২০৩৫

সাইক্লোন ডিটওয়া (Cyclone Ditwah)-এর ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির পর শ্রীলঙ্কার বীমা খাতে বড় ধরনের ঘাটতি প্রকাশ পাওয়ায় দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও শিল্প অংশীজনরা একটি নতুন জাতীয় রূপরেখা ঘোষণা করেছে। “ভিশন ২০৩৫” নামে এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটির বীমা প্রবেশ (insurance penetration) হার দ্বিগুণ করে ২ শতাংশে উন্নীত করা।

শ্রীলঙ্কার বীমা নিয়ন্ত্রক কমিশন (IRCSL) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে আঘাত হানা সাইক্লোন ডিটওয়ার কারণে দেশে আনুমানিক ৪.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, যা ২০২৪ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪ শতাংশের সমান। তবে আশ্চর্যজনকভাবে এই ক্ষতির মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫৮.৫ বিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপি), যা মোট ক্ষতির মাত্র ৬ শতাংশ।

অর্থাৎ, ক্ষতির প্রায় ৯৪ শতাংশই কোনো বীমা সুরক্ষার আওতায় ছিল না। এই বিশাল ব্যবধানকে দেশটির অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সরকারকে বাধ্য হয়ে “শেষ আশ্রয়দাতা বীমাকারী” হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে, যার ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাত থেকে অর্থ সরিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যয় করতে হচ্ছে।

এই সংকট মোকাবিলায় IRCSL-এর নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কা ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন, ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন, অ্যাকচুয়ারিয়াল অ্যাসোসিয়েশন এবং ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউট যৌথভাবে “ভিশন ২০৩৫” রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এই পরিকল্পনা ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে।

রোডম্যাপের প্রধান লক্ষ্য ও দিকগুলো—

বিষয় লক্ষ্য
বীমা প্রবেশ হার ১% থেকে ২% এর বেশি
শিল্পের প্রিমিয়াম বাজার ৩.২ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ ট্রিলিয়ন রুপি)
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ২৫% বৃদ্ধি
এজেন্ট সংখ্যা ৪৯,০০০+ থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি
কর্মী সংখ্যা ২০,০০০+ থেকে সম্প্রসারণ

এই পরিকল্পনায় কয়েকটি মূল কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—নতুন বীমা পণ্য উদ্ভাবন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিতরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও কর নীতিমালার আধুনিকায়ন।

এছাড়া খাতটির সক্ষমতা বাড়াতে মূলধন ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা, বিনিয়োগ সুযোগ বৃদ্ধি, উন্নত তথ্য ব্যবস্থাপনা, ভোক্তা সুরক্ষা জোরদার এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর্থিক সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়টিও এই রোডম্যাপে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীলঙ্কার বর্তমান বীমা কাঠামো দুর্যোগ মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়। বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জনগণের বিপুল অংশ বীমার বাইরে থাকায় রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। “ভিশন ২০৩৫” সেই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বীমা ব্যবস্থা গড়ার প্রচেষ্টা।

IRCSL মনে করছে, বীমা প্রবেশ হার দ্বিগুণ করতে পারলে শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তাই নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে দুর্যোগ-পরবর্তী আর্থিক চাপ কমিয়ে সরকারকে উন্নয়নমূলক খাতে বেশি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে, সাইক্লোন ডিটওয়ার ধ্বংসযজ্ঞ শ্রীলঙ্কার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। সেই অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করেই “ভিশন ২০৩৫” দেশটির বীমা খাতে এক দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করেছে, যা আগামী দশকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।