এআই-চালিত ওয়ার্ম নিয়ে গবেষকদের সতর্কতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে
খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুন ২০২৬, ৬:৫০ এএম
কানাডার গবেষকদের সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত এক ধরনের ম্যালওয়্যার বা কম্পিউটার ওয়ার্মের সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই ওয়ার্মটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে, নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করতে এবং বিভিন্ন কম্পিউটার সিস্টেমে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম বলে পরীক্ষায় উঠে এসেছে। গবেষণাটি এখনো পিয়ার রিভিউ পর্যায়ে রয়েছে এবং এখনো কোনো বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি।
গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে কানাডার ভেক্টর ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে। প্রকল্পটির নেতৃত্ব দেন নিকোলা প্যাপার্নো এবং গবেষণা দলের প্রধান ছিলেন জোনাস গুয়ান। গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন টম ব্ল্যানচার্ড, হানা ফোরস্টার, হেংরুই জিয়া এবং গ্যাব্রিয়েল হুয়াং।
এআই-ওয়ার্মের কার্যপ্রণালী ও সক্ষমতা
এই এআই-ওয়ার্ম প্রতিটি নতুন সিস্টেমে প্রবেশ করার পর সেটি বিশ্লেষণ করে এবং সংশ্লিষ্ট অপারেটিং সিস্টেম, সার্ভিস ও নেটওয়ার্ক পোর্ট সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর সম্ভাব্য দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিজস্ব আক্রমণ কৌশল তৈরি করে। ব্যর্থ হলে এটি বিকল্প কৌশল ব্যবহার করে পুনরায় আক্রমণের চেষ্টা করে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ওয়ার্মটি পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্কে উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। নিচের টেবিলে এর প্রধান ফলাফল উপস্থাপন করা হলো—
সূচক
ফলাফল
পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্কের যন্ত্র সংখ্যা
৩৩টি
গড় দৈনিক দুর্বলতা শনাক্ত
৩১টি
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দখল
২৩টি যন্ত্র
নিজস্ব কপি তৈরি
২০টি যন্ত্র
মোট দুর্বলতা শনাক্তের হার
৭৪%
বিস্তার সক্ষমতা
৬২% যন্ত্রে
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সাত দিনের মধ্যে ওয়ার্মটি নেটওয়ার্কের ৬২ শতাংশ যন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়েছে।
নতুন ধরনের সাইবার ঝুঁকি
প্রচলিত কম্পিউটার ওয়ার্ম সাধারণত নির্দিষ্ট দুর্বলতা বা এক্সপ্লয়েট ব্যবহার করে ছড়িয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালের ‘ওয়ানাক্রাই’ ওয়ার্ম বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের ক্ষতি করেছিল এবং একই বছরে ‘নটপেটিয়া’ নামের ওয়ার্ম বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। তবে সেই ওয়ার্মগুলোর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট দুর্বলতা ঠিক করলে সংক্রমণ থামানো সম্ভব ছিল।
কিন্তু নতুন এআই-ওয়ার্মের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা নেই। এটি প্রতিটি নতুন সিস্টেমে গিয়ে নিজে থেকেই নতুন দুর্বলতা খুঁজে বের করে আক্রমণ কৌশল তৈরি করতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট দুর্বলতা বন্ধ করলেও পুরো আক্রমণ থামানো কঠিন হয়ে পড়ে।
জিপিইউ ব্যবহার ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা
গবেষণায় দেখা যায়, যখন ওয়ার্মটি শক্তিশালী গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ)-তে প্রবেশ করে, তখন সেটি সেই যন্ত্রের সক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে আক্রান্ত যন্ত্রগুলো এক ধরনের “হোস্ট অবকাঠামো”তে পরিণত হয়, যা ভবিষ্যতের আক্রমণকে আরও সহজ করে তোলে।
এ ধরনের ওয়ার্ম কোনো বাণিজ্যিক এআই সেবা ব্যবহার করে না। এটি ওপেন-সোর্স মডেলের মাধ্যমে কাজ করে, যা একটি সাধারণ জিপিইউ-তে চালানো সম্ভব। ফলে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা নীতিমালা যেমন OpenAI বা Anthropic এর মতো কোম্পানির ফিল্টারিং ব্যবস্থা এ ধরনের হুমকি পুরোপুরি প্রতিরোধে সক্ষম নাও হতে পারে।
পরীক্ষার সারাংশ
গবেষণার ফলাফলগুলো সংক্ষেপে নিচের মতো—
৩৩টি ডিভাইসের নেটওয়ার্কে পরীক্ষা
১৫টি পৃথক পরীক্ষামূলক রান
প্রতিদিন গড়ে ৩১টি দুর্বলতা শনাক্ত
৭৪% দুর্বলতা সনাক্তকরণ সক্ষমতা
৬২% ডিভাইসে বিস্তার
এছাড়া ওয়ার্মটি ২০২৬ সালে প্রকাশিত তিনটি নতুন নিরাপত্তা দুর্বলতাও কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ কৌশল
গবেষকেরা কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
জিরো-ট্রাস্ট আর্কিটেকচার ব্যবহার
নেটওয়ার্ক মাইক্রো-সেগমেন্টেশন
ধারাবাহিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ
এআই-ভিত্তিক সিস্টেমের নিয়মিত অডিট
তাদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ওয়ার্ম আরও দ্রুতগতিতে কাজ করতে সক্ষম হবে, কারণ এআই মডেল ও হার্ডওয়্যার ক্ষমতা ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে।
নৈতিক দিক ও ঝুঁকি
গবেষকেরা স্বীকার করেছেন, এই প্রযুক্তি দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (dual-use), অর্থাৎ এটি সাইবার নিরাপত্তা উন্নয়নের পাশাপাশি ক্ষতিকর উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা সম্ভব। তাই গবেষণার কিছু প্রযুক্তিগত অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
গবেষণাটি এখনো পিয়ার রিভিউ পর্যায়ে রয়েছে এবং অন্যান্য স্বাধীন গবেষকরা এটি যাচাই করছেন। গবেষকরা মনে করেন, এই ধরনের হুমকি মোকাবিলায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মন্তব্য