মিরপুরে ককটেল হামলায় নতুন আতঙ্ক, বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা প্রশ্নে
খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরে আলোচিত ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন হত্যা মামলার বাদী ও নিহতের ছোট ভাই আফরোজ উদ্দিনের বাসা লক্ষ্য করে ককটেল হামলার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে সংঘটিত এই হামলায় কেউ হতাহত না হলেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন একটি হত্যা মামলার বাদীর বাসভবনে এ ধরনের হামলা বিচারপ্রক্রিয়ার নিরাপত্তা ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ব্যাটারিচালিত একটি রিকশায় করে আসা দুই ব্যক্তি আফরোজ উদ্দিনের বাড়ি লক্ষ্য করে একটি ককটেল নিক্ষেপ করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তবে ককটেলটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত না করে বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে থাকা একটি পিকআপের ওপর গিয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের পর গাড়িটিতে আগুন ধরে যায়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে বাড়ির সদস্যরা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করে আগুন নিভিয়ে ফেলেন। ফলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।
ঘটনার পরপরই জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ এবং মিরপুর থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ করেন। তদন্তকারীরা আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজও পর্যালোচনা শুরু করেছেন।
আফরোজ উদ্দিনের অভিযোগ, তাঁর ভাই আফতাব উদ্দিন হত্যা মামলাটি প্রত্যাহার করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আসামিপক্ষের লোকজন বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দিয়ে আসছিল। এ বিষয়ে অতীতে একাধিক সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পর্বে তিনি ও অন্যান্য সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার পর আসামিদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক হামলাটি সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলেই তিনি মনে করছেন।
মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে তদন্তে হত্যা মামলার আসামিদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ভুক্তভোগী চাইলে এ ঘটনায় পৃথক মামলা দায়ের করতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
আফতাব উদ্দিন হত্যা মামলাটি দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন। ২০০৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর মিরপুরের নিজ বাসার কাছে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হওয়ার তিন দিন পর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্স পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত আফতাব উদ্দিন ওই এলাকার একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।
হত্যার পর দায়ের হওয়া মামলায় একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাঁদের সহযোগীদের আসামি করা হয়। তদন্ত শেষে মোট ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও অনেকে এখনো পলাতক। আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে মামলাটি একাধিকবার জটিলতার মুখে পড়ে। একসময় রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলাটি প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচারপ্রক্রিয়া পুনরায় চালু হয়।
বর্তমানে মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩–এ সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। তবে বাদীপক্ষের অভিযোগ, আসামিদের বারবার সময়ের আবেদন, প্রভাব খাটানোর চেষ্টা এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে বিচারকাজ দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে।
এদিকে নিহত আফতাব উদ্দিনের ৯৯ বছর বয়সী মা আফরোজা বেগম ছেলের হত্যার বিচার দেখে যেতে চান। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, মৃত্যুর আগে অন্তত তাঁর সন্তানের হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার প্রত্যক্ষ করার সুযোগ যেন পান।
সাম্প্রতিক ককটেল হামলার পর পরিবারটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা আলোচিত এই হত্যা মামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে।