খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জুলাই ২০২৬, ২:৭ পিএম
গাড়ির বিমা বা প্রিমিয়ামের খরচ কিছুটা কমাতে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য বিমা কোম্পানির হাতে তুলে দেবেন কি না—আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে এখন এটিই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। গাড়িচালকদের আচরণ ও গাড়ি চালানোর গতিবিধি সার্বক্ষণিক নজরদারির বিনিময়ে প্রিমিয়ামে বিশেষ ছাড় দেওয়ার একটি নতুন আইনগত প্রস্তাব নিয়ে সেখানে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। ‘অ্যাসেম্বলি বিল ৩১১’ নামের এই প্রস্তাবিত বিলটি ক্যালিফোর্নিয়ার দীর্ঘদিনের প্রচলিত বিমা আইনকে আমূল বদলে দেবে। তবে গাড়িচালকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা ও বিমা সুরক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং স্বয়ং ক্যালিফোর্নিয়ার বিমা বিভাগ এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করছে।
প্রস্তাবিত এই আইনের মূল ভিত্তি হলো ‘টেলিম্যাটিক্স’ (Telematics) প্রযুক্তি। এটি মূলত গাড়িতে বা স্মার্টফোনে ইনস্টল করা এক ধরনের বিশেষ সফটওয়্যার বা ডিভাইস, যা গাড়ির রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক তথ্য সরাসরি বিমা কোম্পানির কাছে পাঠাতে পারে। চালক কত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছেন, কখন এবং কত জোরে ব্রেক চাপছেন, আচমকা গাড়ি ডানে-বামে মোড় নিচ্ছে কি না কিংবা চালকের বর্তমান অবস্থান কোথায়—সবই এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নিবিড়ভাবে ট্র্যাক করা সম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যেই বিমা নির্ধারণে এই প্রযুক্তির ব্যবহার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। এখানকার বর্তমান আইন অনুযায়ী, একজন চালকের পূর্বের নিরাপদ ড্রাইভিং রেকর্ড, মোট কত মাইল গাড়ি চালিয়েছেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতা বিবেচনা করেই বিমার কিস্তি বা প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়। নতুন বিলটি পাস হলে চালকরা নিজেদের মোটরযান বিভাগের (ডিএমভি) নথির পাশাপাশি এই টেলিম্যাটিক্স ডেটাও ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
এই বিলের পক্ষের মানুষ ও বিভিন্ন সড়ক নিরাপত্তা সংগঠনের দাবি, এই প্রযুক্তি চালু হলে চালকদের মধ্যে ভালো ও সতর্কভাবে গাড়ি চালানোর একটি ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। কারণ ভালো গাড়ি চালালে আর্থিক ছাড় পাওয়া যাবে, যা পরোক্ষভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনবে। প্রকাশ্য শুনানিতে বেঞ্জামিন নামের এক ২১ বছর বয়সী সাইকেল আরোহীর মা কেলি মোন্টালভো আবেগঘন কণ্ঠে জানান, ২০২০ সালে এক অসাবধান চালকের টেক্সট মেসেজ লেখার খামখেয়ালিতে তাঁর ছেলে প্রাণ হারায়। ওই চালকের পূর্বেও একাধিক ট্রাফিক আইন ভঙ্গের রেকর্ড ছিল। কেলির মতে, যদি এই প্রযুক্তির মাধ্যমে চালকদের আগে থেকেই নজরদারিতে রাখা যেত, তবে হয়তো তাঁর ছেলের মতো অনেক নিরীহ প্রাণ অকালেই ঝরে যেত না। ‘সেফার স্ট্রিটস ফর এভরিওয়ান’ নামক একটি অলাভজনক সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড্যামিয়ান কেভিটও এই বিলের সমর্থনে বিমা শিল্পের অর্থায়নে করা দুটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন, যেখানে দেখা গেছে আর্থিক পুরস্কারের লোভ থাকলে চালকরা গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে দেন।
অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়ার বিমা বিভাগ এবং ‘কনজ্যুমার ওয়াচডগ’-এর মতো ভোক্তা অধিকার কর্মীরা এই বিলের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁকফোকর দেখছেন। বিমা বিভাগের উপ-কমিশনার জোসেফিন ফিগুয়েরো জানান, এই বিলটি পাস হলে সাধারণ মানুষের তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং বিমা কোম্পানিগুলো তৃতীয় পক্ষের অননুমোদিত ভেন্ডরদের কাছে এই সংবেদনশীল ডেটা পাচার করার সুযোগ পাবে। তা ছাড়া, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আসলেই চালকদের টাকা সাশ্রয় হয় কি না, তার কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই।
আমেরিকার ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বিমা প্রশাসনের ২০২৩ সালের একটি বাস্তব পরিসংখ্যানের উদাহরণ দিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া বিমা বিভাগ দেখিয়েছে যে, টেলিম্যাটিক্স প্রযুক্তির আওতায় আসা চালকদের মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশের প্রিমিয়াম কমেছে। বিপরীতে ২৪ শতাংশ চালকের খরচ উল্টো বেড়ে গেছে এবং ৪৫ শতাংশ চালকের বিমা খরচে কোনো পরিবর্তনই আসেনি। উপরন্তু, ম্যারিল্যান্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, থার্ড-পার্টি অ্যাপগুলো চালকের যাতায়াতের রুট বা রাস্তার সম্পূর্ণ ম্যাপ এবং জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মতো অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে ফেলে। ক্যালিফোর্নিয়া বিচার বিভাগের সাম্প্রতিক এক তদন্তেও দেখা গেছে, জেনারেল মোটরসের মতো নামী গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাদের ‘অনস্টার’ ইমার্জেন্সি সেবার আড়ালে গাড়িচালকদের ডেটা বিক্রি করে আসছিল, যার জন্য তাদের বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার কর্মীদের আশঙ্কা, ক্যালিফোর্নিয়ায় আইনগতভাবেই সব গাড়িচালকের জন্য বিমা করা বাধ্যতামূলক। এমন পরিস্থিতিতে এই আইন পাস হলে অনেক মধ্যবিত্ত বা নিম্নআয়ের চালক বাধ্য হয়ে সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর লোভে নিজেদের সাংবিধানিক গোপনীয়তার অধিকার বিমা কোম্পানির কাছে বন্ধক রাখবেন। অথচ ক্যালিফোর্নিয়ার সংবিধানে নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এই সফটওয়্যারগুলোর অ্যালগরিদম অনেক সময় চালকের কর্মস্থল বা বসবাসের এলাকার ওপর ভিত্তি করে একচোখা ও বৈষম্যমূলক আচরণ করে, যা দরিদ্র ও কৃষ্ণাঙ্গ চালকদের জন্য উল্টো বিমার খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। সব মিলিয়ে, মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের বিনিময়ে বিমার কিস্তি কমানোর এই বিতর্কিত বিলটি বর্তমানে মার্কিন রাজনীতি ও ভোক্তা অধিকারের ময়দানে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
মন্তব্য