খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
কুমিল্লায় মাত্র তিন ঘণ্টার অতি ভারী বর্ষণে পুরো নগরী যখন স্থবির, তখন এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি—সবখানেই তখন থইথই করছে হাঁটু থেকে কোমরপানি। এমন প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই কোমরপানি মাড়িয়ে পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হয় কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের ১ হাজার ২০৯ জন পরীক্ষার্থীকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে এই দুর্ভোগের চিত্র উঠে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। পরীক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত ওই পরীক্ষাকেন্দ্রটিই পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।
সোমবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম কেন্দ্র পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, যেকোনো সময় আবারও ভারী বর্ষণ হলে এই কেন্দ্রে একই ধরনের জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই এই আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১৫ জুলাই (বুধবার) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পরবর্তী পরীক্ষা এবং এর পরের সব পরীক্ষা কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরিবর্তে নগরের ছাতিপট্টি এলাকায় অবস্থিত অজিত গুহ মহাবিদ্যালয় কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে।
হঠাৎ করে একটি বড় কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের অন্য কেন্দ্রে স্থানান্তর করায় আসন সংকট বা ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হবে কি না, এমন একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। এই বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম আশ্বস্ত করে বলেন, “অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ে বর্তমানে এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র সচল রয়েছে এবং সেখানে অতিরিক্ত পরীক্ষার্থী ধারণ করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা আছে। ফলে নতুন করে পরীক্ষার্থীরা যুক্ত হলেও পরীক্ষা গ্রহণে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সমস্যা হবে না বলে আমরা আশা করছি।”
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ছয়টা থেকে নয়টা—এই মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে কুমিল্লা নগরে ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। আকস্মিক এই অতি ভারী বৃষ্টির কারণে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো শহর অচল হয়ে যায়। তবে সবচেয়ে নাজুক ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র এলাকায়। কলেজের পুরো আঙিনা ও চারপাশের রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে ঢুকতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েন। অনেকের পরনের পোশাক ও পরীক্ষার প্রবেশপত্র ভিজে যায়।
পরীক্ষার্থীদের এই মানবিক বিপর্যয় দেখে পরবর্তীতে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। দ্রুততার সঙ্গে কয়েকটি প্লাস্টিকের নৌকা ও ভ্যানের ব্যবস্থা করে পরীক্ষার্থীদের জলাবদ্ধ রাস্তা পার করে মূল কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে ততক্ষণে শিক্ষার্থীদের যে মানসিক ও শারীরিক ধকল পোহাতে হয়েছে, তা পরীক্ষার হলের আবহাওয়াকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।
শিক্ষা বোর্ডের এই দ্রুত কেন্দ্র পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীরা। তাদের মতে, জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, যা পরীক্ষার খাতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নতুন কেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা অন্তত সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দিতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভাঙা ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও শহরের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে প্রতি বছরই বর্ষায় কুমিল্লাবাসীকে এই ভোগান্তি পোহাতে হয়, যার ভুক্তভোগী এবার হতে হলো কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। দূরদর্শী এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী পরীক্ষাগুলো নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।