দেশে হাম ও হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের শরীরে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছিল, আর বাকি ছয়জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৯৯০ শিশু। এর মধ্যে ১২২ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম শনাক্ত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুটি ঢাকার বাসিন্দা। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ছয় শিশুর মধ্যে চারজন ঢাকা বিভাগের এবং দুজন সিলেট বিভাগের। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক রয়ে গেছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৭৬৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছিল, আর ৬৭১ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। একই সময়ে এক লাখ ১৩ হাজার ২৪৪ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৭৩৫ জনের শরীরে পরীক্ষায় সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
হাসপাতালভিত্তিক তথ্যেও চাপের চিত্র স্পষ্ট। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৮৩১ শিশু। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছে ৯০০ শিশু। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৯৬ হাজার ২৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯২ হাজার ৩৮৩ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে এখনও হাজারো শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
নিচে ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পাওয়া প্রধান পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো—
সূচক
সংখ্যা
মোট মৃত্যু
৭৬৬
হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মৃত্যু
৯৫
হামের উপসর্গে মৃত্যু
৬৭১
গত ২৪ ঘণ্টায় মোট মৃত্যু
৭
গত ২৪ ঘণ্টায় হাম নিশ্চিত হয়ে মৃত্যু
১
গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গে মৃত্যু
৬
মোট উপসর্গ শনাক্ত
১,১৩,২৪৪
মোট হাম নিশ্চিত
১৩,৭৩৫
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত
৯৯০
গত ২৪ ঘণ্টায় হাম নিশ্চিত
১২২
মোট হাসপাতালে ভর্তি
৯৬,০২৭
চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে
৯২,৩৮৩
গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি
৮৩১
গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র
৯০০
বিভাগভিত্তিক মৃত্যুর হিসাবেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ঢাকা বিভাগ। সেখানে হামের উপসর্গে মারা গেছে ২৯১ শিশু। এরপর রয়েছে সিলেট বিভাগ, যেখানে মৃত্যু হয়েছে ৯৩ শিশুর। রাজশাহীতে ৮৯, ময়মনসিংহে ৬৩, চট্টগ্রামে ৫৪, বরিশালে ৪৩, খুলনায় ২৯ এবং রংপুর বিভাগে ৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বর্তমান পরিস্থিতি দেশের সাম্প্রতিক জনস্বাস্থ্য ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গত আড়াই দশকে দেশে হামে এত ব্যাপক সংক্রমণ ও প্রাণহানির নজির নেই। ২০০৫ সালে দেশে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯৩৪ জন হামে আক্রান্ত হয়েছিল। এরপর জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যে রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমে আসে। এমনকি গত বছর সারা দেশে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩২ জন।
কিন্তু চলতি বছরের পরিস্থিতি সেই সাফল্যকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। গণটিকাদান কর্মসূচি শুরুর দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিদিন প্রায় এক হাজার নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণের বিস্তার রোধে টিকাদানের আওতা আরও বাড়ানো, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, আক্রান্ত শিশুদের সময়মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।