নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি সাদিক হোসেন (শুভ) নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও নিজ গ্রামে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সাহসিকতা ও দায়িত্বনিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রীয় পদক পাওয়া এই তরুণ ডুবুরির আকস্মিক মৃত্যু শুধু পরিবারের জন্য নয়, স্থানীয় মানুষের কাছেও এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ছেলের অর্জিত রাষ্ট্রীয় পদক বুকে জড়িয়ে মায়ের কান্না আর শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের কুমড়াকান্দি গ্রামে নেমে এসেছে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ।
সাদিক হোসেনের বাড়ি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কুমড়াকান্দি গ্রামে। তিনি আশরাফ আলীর ছেলে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দায়িত্বশীল ও কর্মনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে তিনি শুধু পরিবারের ভরসাই ছিলেন না, এলাকাতেও একজন বিনয়ী ও সবার প্রিয় তরুণ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ ফায়ারঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে একটি জেটির সামনে জমে থাকা কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজ চলছিল। বেলা ১১টার দিকে সেই দায়িত্ব পালনকালে সাদিক হোসেন নদীতে নিখোঁজ হন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। দীর্ঘ প্রায় আট ঘণ্টার অনুসন্ধানের পর সন্ধ্যা সাতটার দিকে তাঁরই এক সহকর্মী ডুবুরি নদীর তলদেশ থেকে সাদিকের মরদেহ উদ্ধার করেন।
পরিবার জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার ঢাকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রধান কার্যালয়ে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ নিজ গ্রাম গোয়ালন্দে নেওয়া হলে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় কুমড়াকান্দি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মাত্র কয়েক বছরের চাকরিজীবনেই সাদিক নিজের সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর বাহিনীতে যোগ দেন এবং নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর ফায়ার স্টেশনে ডুবুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নদী ও জলাশয়ে পরিচালিত বিভিন্ন উদ্ধার অভিযানে নিষ্ঠা, দক্ষতা এবং সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছরের ১৯ মে তাঁকে প্রেসিডেন্ট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স (সেবা) পদক প্রদান করা হয়। দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই সেই পদকপ্রাপ্ত সদস্যের মৃত্যু সহকর্মীদের মাঝেও গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।
শুক্রবার সকালে সাদিকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং বিভিন্ন এলাকার মানুষ শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে ভিড় করছেন। শোকাহত স্বজনদের কান্নায় পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দৃশ্য ছিল তাঁর মা লিলি বেগমের আহাজারি। ছেলের রাষ্ট্রীয় পদক হাতে নিয়ে তিনি বারবার বিলাপ করছিলেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, দুই বছর আগে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন। পুত্রবধূ সাদিয়া খাতুনকে নিয়ে সাদিকের ছোট্ট সংসারটি সুখেই চলছিল। তাঁর ভাষায়, “আমার সাদিকের মতো ছেলে আর হবে না। এত ভালো ছেলে আমার কীভাবে চলে গেল?”
মা আরও জানান, মাত্র তিন দিন আগেও ছেলের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছিল। সাদিক জানিয়েছিল, আগামী রোববার বাড়ি আসবে। সে সময় বাবার কাছে পাঁচ হাজার টাকা পাঠানোর কথাও বলেছিল, কারণ তাঁর কাছে টাকা ছিল না। পরিবারের দাবি, সেই টাকাও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু বাড়ি ফেরা আর হলো না।
সাদিক একজন প্রশিক্ষিত ডুবুরি হওয়ায় পানিতে ডুবে তাঁর মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর মা। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, কীভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটল, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ফজলুল হক বলেন, সাদিক ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, দায়িত্বশীল ও সৎ একজন মানুষ। তাঁর মতো ছেলে এলাকায় খুব কমই দেখা যায়। তিনি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সাদিক ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। তাই তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ারও আহ্বান জানান।
দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো সাদিক হোসেনের মৃত্যু আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা প্রতিদিন জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। তাঁদের অনেকের সাহসিকতার গল্প মানুষের জীবন রক্ষা করলেও, কখনও কখনও সেই দায়িত্ব পালনই তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় মূল্য দাবি করে।