চলতি বর্ষা মৌসুমে ময়মনসিংহ অঞ্চলজুড়ে মারাত্মক রূপ ধারণ করছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। জেলাটির প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে মোট ৩৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন, যার সিংহভাগই এসে পৌঁছেছেন চলতি জুলাই মাসে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১ থেকে ২২ জুলাই—এই ২২ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২০ জন ডেঙ্গু রোগী। অথচ বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) এই সংখ্যাটি ছিল ১২৬। চিকিৎসাধীন রোগীদের একটি বড় অংশ ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। তবে বিভাগীয় এই হাসপাতালে আশপাশের অন্যান্য জেলা ও উপজেলা থেকেও অনেক সংকটাপন্ন রোগী সেবা নিতে আসছেন।
চলতি বছর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে ১ জন, জুনে ৩ জন এবং চলতি জুলাই মাসে ১ জন মারা যান। পূর্বের বছরের ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছরই মূলত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই পাঁচ মাসে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চরম আকার ধারণ করে। গত ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে এই হাসপাতালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৭৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১ জনের। তবে পরবর্তী পাঁচ মাসে, অর্থাৎ আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে একলাফে রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২,২২৭ জনে এবং মারা যান ২৮ জন।
বুধবার সকাল ৭টা পর্যন্ত হাসপাতালটির ডেঙ্গু ওয়ার্ডে মোট ৩৯ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছেন ১০ জন এবং সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১১ জন। ডেঙ্গু রোগীদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে গত ২ জুলাই থেকে ২০ শয্যার একটি বিশেষ ডেঙ্গু আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগী প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় মেঝেতেও রোগীদের ঠাঁই নিতে হচ্ছে। ২ জুলাই থেকে ২২ জুলাই দুপুর পর্যন্ত এই ওয়ার্ডে মোট ২৪২ জন রোগী সেবা নিয়েছেন, যার ৫৬ শতাংশই সিটি করপোরেশন এলাকার। বিশেষ করে শহরের নওমহল, আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার ও বাউন্ডারি রোড এলাকা থেকে আসা রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
সংক্রমণের ভয়াবহতা বিচারে ময়মনসিংহ নগরের ৬টি ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ বা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিটি করপোরেশন। ওয়ার্ডগুলো হলো—৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ড। সিটি করপোরেশনের হিসাব মতে, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নগরে মাত্র ৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও জুন মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ জনে এবং ২১ জুলাই পর্যন্ত এক মাসেই নতুন করে আক্রান্ত হন ৫৮ জন। চলতি বছর নগরে মোট আক্রান্ত ৭০ জনের মধ্যে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন জানান, স্পেশাল জোনগুলোতে দিনে দুবেলা মশকনিধন ওষুধ স্প্রে ও ফগিং করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক নালা-নর্দমায় এখনো আবর্জনা জমে আছে এবং ওষুধ ছিটানোর পরও মশার উপদ্রব কমছে না।
কেবল বিভাগীয় হাসপাতালেই নয়, উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও বাড়ছে রোগীদের চাপ। জেলা সিভিল সার্জন দপ্তরের তথ্য মতে, ২২ জুলাই পর্যন্ত জেলার ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, যার মধ্যে বর্তমানে ৫ জন ভর্তি আছেন। সিভিল সার্জন ফয়সল আহমেদ জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের ডেঙ্গু চিকিৎসায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মশকনিধনের পাশাপাশি নাগরিকদের নিজস্ব আঙিনা পরিষ্কার রাখার প্রতি জোর দিচ্ছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।



