খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ই জুলাই ২০২৬, ৫:৩৮ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী মারধর, রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তেজনাকর আচরণ এবং পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও প্রক্টরের কার্যালয়ের আশপাশে সংঘটিত ঘটনাগুলোর পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থী, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্যে ঘটনাটি এখন বহুমাত্রিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৭ জুলাই সংঘটিত ঘটনার সময় রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার এবং তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থী নিরস্ত্র তিন শিক্ষার্থীর ওপর হামলা চালান। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বালি তোলার বেলচা, বাঁশসহ বিভিন্ন বস্তু হাতে নিয়ে তাদের মারধর করা হয়। আহত শিক্ষার্থীরা হলেন মো. আনাস, মাহমুদুল হাসান ও হাসান। পরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ও বিভিন্ন বর্ণনা ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এ ঘটনায় নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয় আহতদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, মারধরের শিকার হওয়া আনাস ও মাহমুদুল হাসানকে পরবর্তীতে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। আনাসের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের কর্মী হওয়ার অভিযোগ তোলা হলেও তিনি নিজে সেই দাবি স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষার্থী এবং একাধিক ছাত্রসংগঠন প্রশ্ন তুলেছে, হামলার শিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল এবং বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো প্রকাশ্যে এই হামলার নিন্দা জানিয়ে দাবি করেছে, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের মতো একটি একাডেমিক পরিবেশে শিক্ষার্থীদের মারধর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এটি ক্যাম্পাসে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, মতবিরোধের সমাধান কখনোই শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়।
ঘটনার জেরে আহত শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসানের বাবা এমএস আসাদ উজ জামান বাদী হয়ে মতিহার থানার মাধ্যমে আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় সালাউদ্দিন আম্মারকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। একই মামলায় রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির, নাজমুস সাকিব, মেহেদী সজীব, ফাহিম রেজা, আরিফুল ইসলাম, আহছান উল্লা ফারহান, সিফাত আবু সালেহ ও নুরুল ইসলাম শহীদসহ মোট নয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সালাউদ্দিন আম্মার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তাদের ওপর প্রথমে ছাত্রলীগ-সমর্থিত ব্যক্তিরা হামলা চালিয়েছিল এবং আত্মরক্ষার জন্যই তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, একটি ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগের পরিচয় দিয়ে হামলার শিকার করা হয়েছে। তিনি হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ঘটনার পর রাকসুর উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনও নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রাকসুর সহ-সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার এবং এজিএস এসএম সালমান সাব্বির। সেখানে সংবাদ পরিবেশন নিয়ে সাংবাদিকদের সমালোচনা করে জাহিদ দাবি করেন, বিভিন্ন গণমাধ্যম একপেশে সংবাদ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তিনি সংবাদমাধ্যমের শব্দচয়ন নিয়ে আপত্তি তুলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন। তার এই বক্তব্যের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের একাধিক সংগঠন তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রাকসুর সব ধরনের সংবাদ বর্জনের ঘোষণা দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, সালাউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগ নতুন নয় বলেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। পূর্বে পোষ্যকোটা আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে উত্তেজনাকর আচরণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ঘটনার সঙ্গে তার নাম আলোচনায় আসে। এছাড়া রাকসু আন্দোলন মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল মজিদ অন্তর অতীতের একটি হত্যাকাণ্ডে আম্মারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা প্রশাসনিকভাবে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
ঘটনার পর বামপন্থী শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট’ উপ-উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে হামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা, রাকসু ভবন ও অন্যান্য সহিংস ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জুলাই-পরবর্তী অমীমাংসিত ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদের বিরুদ্ধে যদি সহিংসতার অভিযোগ ওঠে, তবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।
একই দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি শুরু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি কয়েক দিন ধরে চলবে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
পুরো ঘটনাকে ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন উত্তেজনা বিরাজ করছে। একদিকে হামলার অভিযোগ, অন্যদিকে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অবস্থান, মামলা, তদন্ত এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে সংঘাত—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনের তদন্তের ফল এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর রয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার।
মন্তব্য