দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৮৭২ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি দ্রুত শনাক্তকরণ, সময়মতো চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শনিবার (১ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই সময়ের মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম আক্রান্ত কোনো শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিবন্ধিত হয়নি। মারা যাওয়া তিন শিশুর মধ্যে একজন সিলেট বিভাগের, একজন ময়মনসিংহ বিভাগের এবং একজন রংপুর বিভাগের বাসিন্দা।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংক্রমণের এই সময়ে, অর্থাৎ ১৩৯ দিনে, হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৮৪০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে, আর পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছে ৯৬ শিশু। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসর্গভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়া থেকে বোঝা যায় যে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে পরীক্ষার আগেই জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আনা হচ্ছে অথবা সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত ৮৭২ জনের মধ্যে ৬৮৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ৫৩৮ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। ফলে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ১৫ মার্চ থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৬১ জন। এদের মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৬ হাজার ১৮০ জন। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ১ লাখ ১১ হাজার ৬৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখ ৭ হাজার ৩৯৭ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। রোগটি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে দানা ওঠা এর প্রধান লক্ষণ। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কের জটিল সংক্রমণসহ নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, হামের বিস্তার রোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের হাম-রুবেলা টিকা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়া, প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তি করা এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে রোগীকে আলাদা রাখার মতো স্বাস্থ্যবিধিও কঠোরভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিভাবকদের শিশুদের জ্বর বা হামের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।
মন্তব্য