শ্রীনগরে মাদরাসা শিক্ষকের নিষ্ঠুরতায় মেরুদণ্ড ভেঙে শয্যাশায়ী ৯ বছরের আঁখি

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে পড়া না পারায় দ্বিতীয় শ্রেণির এক অবুঝ শিক্ষার্থীকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এক মাদরাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং ভয়ভীতি দেখানোর পর ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অভিযুক্ত দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর এলাকা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও শিশুটির ওপর নির্মম নির্যাতন

ভুক্তভোগী শিশুর নাম আঁখি আক্তার (৯)। সে শ্রীনগর উপজেলার বিরতারা ইউনিয়নের অন্তর্গত মজিদপুর দয়হাটা এলাকার ‘বাগে নূরানীয়া হাফেজিয়া মাদরাসা’র দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

অভিযোগপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ জুলাই শ্রেণিকক্ষে পড়া বলতে না পারায় মাদরাসার শিক্ষক মো. সাফায়েত ক্ষিপ্ত হয়ে লাঠি দিয়ে আঁখিকে অমানবিক ও বেধড়ক মারধর করেন। নির্যাতনের পর শিশুটিকে হুমকি দেওয়া হয় যে, এই নিষ্ঠুরতার কথা পরিবারকে জানালে তাকে পরবর্তীতে আরও কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে। শিক্ষকের এমন হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে শিশুটি কয়েকদিন ধরে নিজের ব্যথার কথা পরিবারের কাছে চেপে রাখে।

হাড় ভাঙার বিষয়টি প্রকাশ ও চিকিৎসকের বক্তব্য

ঘটনার কয়েকদিন অতিক্রান্ত হলেও আঘাতের কারণে শিশু আঁখির শারীরিক অবস্থার দিন দিন অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথায় শিশুটি শয্যাশায়ী ও কাতর হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা তাকে গভীরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তখন ভীতি কাটিয়ে আঁখি শিক্ষকের নির্যাতনের বর্ণনা পরিবারের সামনে তুলে ধরে।

পরিবারের সদস্যরা কালবিলম্ব না করে শিশুটিকে চিকিৎসার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও এক্স-রে করার পর জানান, শিক্ষকের নির্মম পিটুনির চোটে শিশুটির মেরুদণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ হাড় ভেঙে গেছে।

বিচারপ্রার্থী পরিবারকে চাপ ও এলাকাবাসীর প্রতিবাদ

শিশুটির বাবা মো. আলমগীর খাঁন জানান, ঘটনাটি জানার পরপরই তিনি ন্যায়বিচারের আশায় মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মো. তোফাজ্জলের কাছে যান। কিন্তু প্রধান শিক্ষক ঘটনাটির সুষ্ঠু বিচার না করে উল্টো তা লোকচক্ষুর অন্তরালে চেপে যাওয়ার জন্য পরিবারটিকে বাধ্য করার চেষ্টা করেন।

“আমার মেয়েকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। আমরা প্রধান শিক্ষকের কাছে বিচার চাইতে গেলে তিনি বিষয়টি গোপন রাখতে বলেন। মেয়ের এমন কষ্ট দেখে আমি আর চুপ থাকতে পারিনি, এলাকাবাসীর সঙ্গে পরামর্শ করে আইনের আশ্রয় নিয়েছি।” — মো. আলমগীর খাঁন (ভুক্তভোগী শিশুর বাবা)

প্রধান শিক্ষকের এমন বিতর্কিত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকা দেখে ফুসে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নির্যাতিত শিশুটির বিচার ও অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গত ৩১ জুলাই (শুক্রবার) সকালে মাদরাসা প্রাঙ্গণে বিক্ষোভে নামেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা। পরবর্তীতে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১ আগস্ট (শনিবার) ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার শ্রীনগর থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করে।

আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক অবস্থান

এ বিষয়ে শ্রীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জুয়েল মিয়া জানান, শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চালানো হচ্ছে। তদন্ত শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও শিশুদের ওপর এমন বর্বর নির্যাতন ও তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় কঠোর ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সচেতন সুশীল সমাজ। দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।