খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ১০:২৪ পিএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ঐতিহ্যবাহী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা, হট্টগোল ও পাল্টাপাল্টি হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। হল সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে দুই বহিরাগত অতিথির বিরুদ্ধে কথিত ‘সমকামী কর্মকাণ্ডে’ জড়ানোর অভিযোগ তদন্তকে কেন্দ্র করে রোববার (২ আগস্ট) বিকেলে এ অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে উভয় সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনার মূল সূত্রপাত ঘটে শনিবার, যখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল সংসদের এজিএস ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে দুই ব্যক্তির আপত্তিকর বা সমকামী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে ক্ষমা চাইতে এবং ভবিষ্যতে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হলে রোববার বিকেলে হল প্রশাসন জরুরি তদন্তে নামে।
তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে এজিএস ইব্রাহীম খলিল ও তার রুমমেটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। সে সময় হল সংসদের অন্যান্য প্রতিনিধি এবং উভয় রাজনৈতিক সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী কার্যালয় ও তার আশপাশে অবস্থান নেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, তদন্ত চলাকালেই হলের বাইরে ছাত্রদলপন্থী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের ভেতর ঢুকে পড়লে সেখানে অবস্থানরত শিবিরপন্থী নেতাকর্মীদের সাথে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা দ্রুতই হাতাহাতি ও সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষের বিষয়ে উভয় পক্ষই পরস্পরকে দোষারোপ করেছে:
ছাত্রদলের বক্তব্য: শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোছাদ্দিক আল হক শান্তর দাবি, অভিযুক্ত এজিএস ইব্রাহীম খলিলকে বাঁচাতে শিবির পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। ঘটনা ঢাকার জন্য আগের দিনের সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ আনেন। তিনি আরও জানান, তদন্ত চলাকালে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিলে শিবিরের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়, যাতে তাদের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
শিবিরের বক্তব্য: অন্যদিকে শহীদুল্লাহ হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) তৌকির হাসান জানান, তদন্তের ডাকে তারা এজিএস ও তার রুমমেটকে নিয়ে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে জোরপূর্বক ঢুকে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি করে। শিবিরের এক শিক্ষার্থী এই ঘটনার ভিডিও বা ছবি তোলার চেষ্টা করলে তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরবর্তীতে নিরাপত্তা নিতে তারা প্রাধ্যক্ষের কক্ষে আশ্রয় নিলেও সেখানেও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে এজিএস ইব্রাহীম খলিল জানান, তাঁর দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসে কিছু সময় বিশ্রামের জন্য রুম ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিলেন এবং তার সাথে আরেকজন ছিল। খলিলের দাবি, ঘটনার সময় তিনি হলে উপস্থিত ছিলেন না, বন্ধুদের সাথে মাওয়ায় ভ্রমণে ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখে তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং এ ঘটনায় তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেবেন বলে নিশ্চিত করেন।
এদিকে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে টিএসসি সংলগ্ন রাজু ভাস্কর্যের সামনে এসে সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশে ঢাবি শাখা শিবিরের সভাপতি মু. মহিউদ্দিন খান অভিযোগ করে বলেন, “আমরা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আমাদের দাবি তুলে ধরছি, কিন্তু দফায় দফায় হল সংসদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।” তিনি এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ঘটনার পরপরই হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম ভূঞা পদত্যাগ করেছেন বলে দুই পক্ষ দাবি করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা স্পষ্ট ভাষায় নাকচ করেছে। ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান নিশ্চিত করেছেন যে প্রাধ্যক্ষ পদত্যাগ করেননি।
সার্বিক বিষয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের হাউস টিউটর ড. মো. আনোয়ার হোসাইন ভূঁইয়া এবং ঢাবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল রতন জানান, প্রশাসনিক মিটিং চলাকালে সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হলেও পরবর্তীতে প্রক্টরিয়াল টিমের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখে তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য