খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৩৬ পিএম
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে যে কজন মনীষী আধুনিক গদ্যের ভিত নির্মাণ করেছেন, তাঁদের অন্যতম প্রমথ চৌধুরী। তিনি ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, সম্পাদক, শিক্ষাবিদ এবং বাংলা চলিত গদ্যরীতির অন্যতম প্রধান প্রবর্তক। তাঁর সাহিত্যিক ছদ্মনাম ‘বীরবল’—এই নামেই তিনি বাংলা সাহিত্যে তীক্ষ্ণ রসবোধ, নির্মোহ বিশ্লেষণ, বিদ্রূপ ও ব্যঙ্গরসের এক অনন্য ধারা সৃষ্টি করেন। বাংলা সাহিত্যে আধুনিক বিদ্রূপাত্মক প্রবন্ধ রচনার পথিকৃৎ হিসেবেও তিনি স্মরণীয়।
১৮৬৮ সালের ৭ আগস্ট যশোর জেলায় তাঁর জন্ম। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল পাবনা জেলার হরিপুর গ্রামে। তাঁর বাবা দুর্গাদাস চৌধুরী ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী জমিদার। শৈশব থেকেই প্রমথ চৌধুরী মেধা, মনন ও সাহিত্যরুচির পরিচয় দেন।
তিনি কলকাতার বিখ্যাত হেয়ার স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। আইন বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণের পর কিছুদিন কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজে অধ্যাপনা করেন। কর্মজীবনের এক পর্যায়ে তিনি ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করেন।
প্রমথ চৌধুরীর ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঠাকুর পরিবারের নিবিড় সম্পর্ক। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীকে বিয়ে করেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এই দম্পতি ছিলেন তাঁদের সময়ের অন্যতম উজ্জ্বল নাম।
১৯১৪ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সবুজপত্র’ বাংলা সাহিত্যকে নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়। এই পত্রিকার মাধ্যমেই বাংলা গদ্যে চলিত ভাষার ব্যবহার জনপ্রিয়তা লাভ করে। সাধুভাষার পরিবর্তে প্রাণবন্ত, সহজ, কথ্যভিত্তিক ভাষা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। পরবর্তীকালে তিনি ‘বিশ্বভারতী’ পত্রিকাও সম্পাদনা করেন।
তাঁর লেখায় যুক্তিবাদ, মানবতাবোধ, রসবোধ এবং সমাজ-সমালোচনার এক অনন্য সমন্বয় লক্ষ করা যায়। সহজ ভাষায় গভীর চিন্তার প্রকাশই ছিল তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—
প্রবন্ধ: তেল-নুন-লাকড়ি, বীরবলের হালখাতা, নানাকথা, আমাদের শিক্ষা, রায়তের কথা, নানাচর্চা।
গল্পগ্রন্থ: চার-ইয়ারী কথা, আহুতি, নীললোহিত।
কাব্যগ্রন্থ: সনেট পঞ্চাশৎ, পদচারণ।
১৯৪৬ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলা সাহিত্যের এই প্রজ্ঞাবান মনীষী পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর প্রবর্তিত চলিত গদ্যরীতি, প্রখর চিন্তাশক্তি, রসবোধ ও ব্যতিক্রমী সাহিত্যদর্শন আজও বাংলা সাহিত্যকে সমানভাবে আলোকিত করে চলেছে।
জন্মবার্ষিকীতে বাংলা সাহিত্যের অনন্য ‘বীরবল’ প্রমথ চৌধুরীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণাম।
মন্তব্য