খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ১০:১১ পিএম
রাজধানীর বকশীবাজারে অবস্থিত ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় চার দিন আগের সংঘর্ষের পর থেকে আধিপত্য বজায় রাখা ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণে থাকা হলে প্রবেশের চেষ্টায় এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ৪ আগস্ট পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের হটিয়ে হলের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্রদল। সেই ঘটনার পর থেকে বেশ কয়েকবার হলে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন শিবিরের নেতাকর্মীরা। পুলিশি বাধা এবং মাদ্রাসা প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে তারা হলে উঠতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
আজ শনিবার দুপুর ১২টার পর থেকে বকশীবাজার মোড় এলাকায় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের জড়ো হতে দেখা যায়। দুপুর দুইটার দিকে শিবিরের নেতাকর্মীরা দলবদ্ধ হয়ে হলে ঢোকার প্রয়াস চালালে পুলিশ তাদের ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেয়। এর আগেও গত বুধবার একই কায়দায় হলে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিল তারা, তখনও পুলিশের বাধায় তারা ব্যর্থ হয়। শনিবার বেলা আড়াইটা পর্যন্ত শিবিরের নেতাকর্মীরা মোড়ে অপেক্ষা করার পর সেখান থেকে সরে গেলে পুলিশ ব্যারিকেড তুলে নেয়।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের মারাত্মক অভিযোগ তোলা হয়েছে। সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি আবদুল আলীম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ছাত্রদল ও যুবদলের সশস্ত্র কর্মীরা হলে অবস্থান নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করলেও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অন্যদিকে বৈধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলে উঠতে গেলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে হলে অবস্থান করতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব প্রশাসনের হলেও তারা একদম নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য পরিষ্কার। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আমিনুল কবির জানান, চলমান পরীক্ষা যাদের রয়েছে তাদের প্রবেশপত্র যাচাই করে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যেকোনো সাধারণ ও বৈধ শিক্ষার্থী হলে প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশ কোনো বাধা দিচ্ছে না। তবে কোনো রাজনৈতিক দলকে দলবল নিয়ে হলে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, কারণ এতে করে পুনরায় সংঘর্ষ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবক্ষয় ঘটতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ৪ আগস্ট দুপুরে মাদ্রাসার আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলের কক্ষগুলোতে তালা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিকেলের দিকে এই বাকবিতণ্ডা রূপ নেয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে। সংঘর্ষ চলার একপর্যায়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হলে প্রবেশ করেন এবং হল কক্ষগুলোর দখল নেন।
শিবিরের অভিযোগ, দখলের সময় হলের প্রায় সবকটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয় এবং বেশ কয়েকটি ল্যাপটপ, মোটরবাইক ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনার পর থেকে হলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান ধরে রেখেছেন।
ছাত্রদল অবশ্য লুটপাট ও ভাঙচুরের এসব দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। নিজেদের মাদ্রাসা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রার্থী দাবি করা সাদ চৌধুরী জানান, শিবিরের নেতাকর্মীরা সেদিন বহিরাগত সন্ত্রাসীদের ডেকে এনে ছাত্রদল কর্মীদের কক্ষগুলোতে তাণ্ডব চালায় এবং নগদ টাকা লুটপাট করে। তারা সে সময় আত্মরক্ষার্থে বাইরে থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে হলে ফিরে আসেন। সাদ চৌধুরী জানান, বর্তমানে তাদের অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জন কর্মী হলে অবস্থান করছেন। তবে তারা সহাবস্থানে বিশ্বাসী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছাত্রদলের ওপর মহল থেকে নির্দেশনা রয়েছে যে সাধারণ ও বৈধ শিক্ষার্থীরা যাতে থাকতে পারে। তবে শিবিরের নেতাকর্মীরা এককভাবে পুরো হল দখলে রাখতে পারবে না, হল প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে কে কয়টি রুমে থাকবে তা নির্ধারিত হতে হবে।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতে হল ও মাদ্রাসা প্রশাসনের চরম দায়িত্বহীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। হলে কারা অবস্থান করছেন তা জানতে আল্লামা কাশগরী হলের প্রভোস্ট মো. মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বিষয়টি সহকারী অধ্যক্ষ দেখছেন বলে জানিয়ে এড়িয়ে যান। পরবর্তীতে সহকারী অধ্যক্ষ মো. আশরাফুল করিবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি মিটিংয়ের অজুহাত দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন এবং পরে আর কোনো ফোন ধরেননি।
হলের বিরোধের মধ্যেই আজ শনিবার বিকেলে আলিয়া মাদ্রাসা আল্লামা কাশগরী (রহ.) হল-সংলগ্ন প্রধান সড়কের পাশ থেকে একটি ককটেলসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। কালো স্কচটেপে মোড়ানো বস্তুটি রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। পরবর্তীতে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে বস্তুটি পরীক্ষা করে দেখে নিষ্ক্রিয় করে।
সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়ে ডিএমপির লালবাগ জোনের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, সকালের দিকে কিছু উত্তেজনা থাকলেও বিকালের পর থেকে এলাকা শান্ত রয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মন্তব্য