ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ঐতিহাসিক ক্লাব লিভারপুলের প্রায় এক–তৃতীয়াংশ শেয়ার বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগিয়ে গেছে। ক্লাবের মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠান ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ (এফএসজি) আন্তর্জাতিক এক প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী জোটের সঙ্গে এই দরকষাকষি করছে। সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
প্রস্তাবিত এই শক্তিশালী জোটটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ব্রিটিশ–ভারতীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী অমিত ভাটিয়া, যিনি ভারতের প্রখ্যাত শিল্পপতি ও ধনকুবের লক্ষী মিত্তালের জামাতা। এই কনসোর্টিয়ামে তাঁর সঙ্গী হয়েছেন ই-কমার্স জায়ান্ট আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এদুয়ার্দো সাভেরিন। জানা গেছে, গত প্রায় তিন মাস ধরে এফএসজির শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে এই বিনিয়োগকারী দলের ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র ‘দ্য টাইমস’কে জানিয়েছে যে আলোচনাটি ইতিবাচক ধারায় এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের দাবি অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এই ঐতিহাসিক চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী মার্সিসাইডের ক্লাব লিভারপুলের বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি পাউন্ড। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে অ্যানফিল্ডের এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের যৌথ মালিকানায় যুক্ত হবেন বিশ্বের বেশ কয়েকজন শীর্ষ ধনকুবের। জোটের নেতৃত্ব দেওয়া অমিত ভাটিয়া সম্প্রতি ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপের ক্লাব কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সের (কোপিআর) পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সেখানে দীর্ঘ ১৮ বছর যুক্ত থাকার পর তিনি নিজের সমুদয় শেয়ার রুবেন জ্ঞানালিঙ্গমের কাছে হস্তান্তর করেন, যা প্রিমিয়ার লিগে তাঁর নতুন এই বিনিয়োগের গুঞ্জনকে আরও জোরালো করেছে।
আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের নিট সম্পদের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘ফোর্বস’-এর হিসাব অনুযায়ী ২৮ হাজার কোটি ডলারের বেশি। অন্যদিকে ফেসবুকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এদুয়ার্দো সাভেরিনের সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর যখন রাশিয়ান ধনকুবের রোমান আব্রামোভিচ চেলসি বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখনও ক্লাবটি কেনার দৌড়ে থাকা একটি জোটের অংশ ছিলেন সাভেরিন।
নতুন মালিকপক্ষ বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে যুক্ত হলেও লিভারপুল চাইলেই রাতারাতি ইচ্ছামতো খেলোয়াড় কিনতে পারবে না। কারণ প্রিমিয়ার লিগের কঠোর ‘স্কোয়াড কস্ট রেশিও’ নিয়ম মেনে চলতে প্রতিটি ক্লাব বাধ্য। এই নিয়ম অনুযায়ী, দলগুলোর সার্বিক পরিচালনা ও স্কোয়াড সংক্রান্ত খরচ ফুটবলীয় আয় এবং খেলোয়াড় বেচাকেনার নিট ফলাফলের সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। তবে নতুন ধনকুবেরদের আগমন ক্লাবের বাণিজ্যিক আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে অবকাঠামোগত মানোন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নে এই নতুন অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ ২০১০ সালের অক্টোবরে তৎকালীন বিতর্কিত মালিক টম হিকস ও জর্জ জিলেটের কাছ থেকে মাত্র ৩০ কোটি পাউন্ডে লিভারপুলের মালিকানা কিনে নেয়। এফএসজির অধীনে দীর্ঘ খরা কাটিয়ে ক্লাবটি দুটি প্রিমিয়ার লিগ ও একটি মর্যাদাপূর্ণ চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জিতেছে। ফুটবলীয় সাফল্যের পাশাপাশি অ্যানফিল্ড স্টেডিয়ামের গ্যালারি সংস্কার এবং কার্কবিতে সর্বাধুনিক অনুশীলন কেন্দ্র তৈরি করেছে মোট ২০ বার ইংলিশ লিগজয়ী দলটি।
নতুন এই শেয়ার হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে এফএসজি কি ধীরে ধীরে অ্যানফিল্ড থেকে বিদায়ের পথ তৈরি করছে—ফুটবল অঙ্গনে এমন প্রশ্নও উঠছে। তবে ‘দ্য টাইমস’ তাদের বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, স্বল্পমেয়াদে এই বিনিয়োগ লিভারপুলের আর্থিক ভিতকে বহুগুণ শক্তিশালী করবে। এর আগেও ২০২৩ সালে ‘ডাইনেস্টি ইকুইটি’র কাছে ৮ থেকে ১৬ কোটি পাউন্ডের বিনিময়ে ক্ষুদ্র একটি শেয়ার বিক্রি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। সে সময় এফএসজির সভাপতি ও লিভারপুলের দৈনন্দিন পরিচালনার প্রধান মাইক গর্ডন পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন যে লিভারপুলের প্রতি তাঁদের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি ও মূল লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকবে।
মন্তব্য