খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৪৬ পিএম
নব্বইয়ের দশকে নিজস্ব গায়কি ও সুরের মূর্ছনায় স্বাধীন সংগীতের ধারায় বিপ্লব এনেছিলেন ভারতীয় সংগীতের প্রবাদপ্রতীম শিল্পী লাকি আলী। বর্ণাঢ্য সংগীতজীবনে দেশ-বিদেশের লাখো শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া ৬৭ বছর বয়সী এই সুরসাধক সম্প্রতি এক কনসার্টে ভক্তদের চরম আবেগে ভাসিয়েছেন। লাইভ পরিবেশনার মাঝে হঠাৎ জীবনের নশ্বরতা ও মৃত্যু নিয়ে তাঁর ব্যক্ত করা আধ্যাত্মিক উপলব্ধি মুহূর্তে স্তব্ধ করে দেয় পুরো মিলনায়তন।
সম্প্রতি একটি জমকালো কনসার্টে মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকদের অভূতপূর্ব ভালোবাসা ও উচ্ছ্বাসের জবাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন লাকি আলী। তিনি বলেন, জীবনের পথচলায় মৃত্যু অনিবার্য এবং সেই সত্যকে তিনি সানন্দে গ্রহণ করতে মুখিয়ে আছেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তিনি যখনই কোনো দূরদূরান্তে কিংবা দেশের বাইরে ভ্রমণে যান, সর্বদা নিজের সঙ্গে ইহরামের কাপড় সাথে রাখেন। এটিকেই তিনি নিজের কাফনের কাপড় হিসেবে দেখেন এবং স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস যেখানেই উঠুক না কেন, তাঁকে যেন সেখানেই চিরদিনের মতো সমাহিত হতে দেওয়া হয়।
শিল্পীর মুখ থেকে এমন গভীর আধ্যাত্মিক ভাবনা ও জীবনবোধের কথা শুনে দর্শক সারিতে উপস্থিত ভক্ত-অনুরাগীদের মাঝে একপ্রকার স্তব্ধতা ও কান্নার আবহ তৈরি হয়। প্রিয় তারকার এমন মন্তব্য শুনে এক ভক্ত নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে দর্শক সারি থেকেই চিৎকার করে বলে ওঠেন, ৩০ বছর পার হয়ে গেছে, তিনি কখনও লাকি আলীকে ছেড়ে যাননি এবং ভবিষ্যতেও যাবেন না। পরম ভালোবাসার এই দৃশ্য ও বক্তব্যের ভিডিওটি পরবর্তীতে নিজের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে পোস্ট করেন লাকি আলী নিজেই। মুহূর্তের মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে। ভিডিওর মন্তব্যের ঘরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাঁর অসংখ্য অনুরাগী প্রিয় শিল্পীর দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
কিংবদন্তি হিন্দি চলচ্চিত্র অভিনেতা মেহমুদের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও লাকি আলী কখনো তারকা বাবার পরিচয়ের ছায়াতলে থিতু হতে চাননি। আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভারতীয় সংগীতাঙ্গনে যখন মূলধারার বলিউড গানের একক আধিপত্য, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের ইন্ডি-পপ বা স্বাধীন সংগীত নিয়ে হাজির হন তিনি। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া প্রথম একক অ্যালবাম ‘সুনো’-র চিরসবুজ গান ‘ও সানাম’ আজও সব বয়সের সংগীতপ্রেমীদের কাছে সমান জনপ্রিয় ও আবেদনময়ী।
স্বতন্ত্র কণ্ঠের এই জাদুকর বেশ কিছু জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেও বিশ্বজোড়া সাফল্য কুড়িয়েছেন। ‘কাহো না পেয়ার হ্যায়’, ‘ইউভা’, ‘বাচনা অ্যায় হাসিনো’, ‘আনজানা আনজানি’ এবং ‘তামাশা’-র মতো সুপারহিট সিনেমাগুলোতে তাঁর গাওয়া গানগুলো ভারতীয় পপ ও ফিল্ম মিউজিকের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। তবে বাণিজ্যিক বিশ্ব থেকে আত্মিক প্রশান্তি বেশি টানে বলে ২০১৫ সালের পর থেকে বলিউডের মূলধারার গান থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নেন তিনি। বর্তমানে মূলত এককভাবে স্বাধীন গান তৈরি ও দেশ-বিদেশে লাইভ শো করেই সময় কাটান।
শিল্পীজীবনের মতো ব্যক্তিগত জীবনও খুব সহজ ছিল না লাকি আলীর। তিনবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও কোনো সংসার শেষ পর্যন্ত টিকেনি। জীবনের এই চড়াই-উতরাই ও একাকীত্ব হয়তো তাঁকে পৃথিবীর মোহ কাটিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর এমন অদ্ভুত আধ্যাত্মিক শক্তি জুগিয়েছে। ব্যক্তিগত বিচ্ছেদ সত্ত্বেও সাবেক স্ত্রীদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং নিজের সন্তানদের প্রতি সবসময় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছেন। জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখা এই মহান শিল্পী নিজের জীবনের অন্তিম অধ্যায়কেও অত্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার বার্তা দিলেন তাঁর সুরের মঞ্চ থেকেই।
মন্তব্য