পটুয়াখালীর লোহালিয়া ও খাপড়াভাঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় দুই সামুদ্রিক মৎস্য বন্দর মহিপুর ও আলীপুর। ইলিশের এই ভর মৌসুমে ঘাটে ট্রলারের ইঞ্জিনের গর্জন আর জেলেদের কর্মব্যস্ততায় দিনরাত মুখরিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে এখন বিরাজ করছে নীরবতা। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বরফকলগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র বরফ সংকট। চাহিদামতো বরফ না পেয়ে সাগরে যাওয়ার সব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও উপকূলের ঘাটে অলস বসে রয়েছে শত শত ট্রলার।
মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোর স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাগরে ইলিশ শিকারের জন্য প্রতিটি ট্রলারে যাত্রাভেদে ১৫০ থেকে ২০০ ক্যান বরফ প্রয়োজন হয়। গভীর সাগরে কয়েক দিন অবস্থান করে সংগৃহীত মাছ তাজা ও বাজারজাতকরণ উপযোগী রাখতে বরফের বিকল্প নেই। কিন্তু প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মহিপুর ও আলীপুরের বরফকলগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন নেমেছে তলানিতে। তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ জমার নির্দিষ্ট সময় পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে বরফকল মালিকরা সময়মতো জোগান দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
সাপ্লাই কমে যাওয়ায় হু হু করে বেড়েছে বরফের দাম। আগে যে বরফের প্রতিটি ক্যান ১৫০ টাকায় কেনা যেত, বাজারে এখন তা দ্বিগুণ দামে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তা সত্ত্বেও চাহিদানুযায়ী বরফ মিলছে না। বাধ্য হয়ে অনেক ব্যবসায়ী ও ট্রলার মালিক চরম ঝুঁকি নিয়ে খুলনা, বাগেরহাট ও বরিশাল থেকে অতিরিক্ত ভাড়ায় ট্রাকে করে বরফ এনে ঘাট সচল রাখার চেষ্টা করছেন। এতে পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও টাকা দুটোই খেসারত দিতে হচ্ছে।
ঘাটের বর্তমান দুর্দশার চিত্র ফুটে ওঠে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাঁশখালী থেকে আসা ‘এফবি সোনাবানু’ ট্রলারের মাঝি সায়েদ মিয়ার কথায়। মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গত পাঁচ দিন ধরে সাগরে যাওয়ার জন্য নোঙর করে আছেন তিনি। সায়েদ মিয়া জানান, একাধিক বরফকল ঘুরেও তিনি পর্যাপ্ত বরফ পাননি। চড়া দামে কেবল ৫০ থেকে ৬০ ক্যান দিতে রাজি হয়েছে একটি কল, যা নিয়ে সাগরে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সাগরে মাছের দেখা মিললেও বরফের অভাবে তারা তাজা মাছ বাজারে আনতে পারবেন না। একইভাবে আলীপুর বন্দরে গত এক সপ্তাহ ধরে আটকে আছে ‘এফবি নুরজাহান’ নামের আরেকটি ট্রলার। মালিক মিজান হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ভরা মৌসুমে ট্রলার বসিয়ে রাখলে দৈনন্দিন খরচ ও জেলেদের খোরাকি জোগাতে গিয়ে লোকসানের পাল্লা কেবল ভারী হচ্ছে।
বরফ ও মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত খান ফিশের আড়তদার রহিম খান জানান, বরফের সংকটের প্রভাব শুধু জেলে বা ট্রলার মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো উপকূলীয় মৎস্য অর্থনীতির ওপর আঘাত হেনেছে। ট্রলার সময়মতো সাগরে যেতে না পারলে মৎস্য আড়তদার, পাইকারি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পরিবহন শ্রমিকদের আয় বন্ধ হয়ে যায়।
বরফকলের মালিকেরা জানিয়েছেন, জেনারেটর চালিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বরফ উৎপাদন করা অসম্ভব, কারণ এতে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। ফলে লোডশেডিংয়ের সময় হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া তাদের অন্য কোনো উপায় থাকে না। সংকট সমাধানে তারা মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য বন্দর এলাকাকে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে জেলা জুড়ে বিদ্যুতের এমন শোচনীয় ব্যবস্থার বিষয়ে পটুয়াখালী পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আবুল কাশেম জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে পুরো জেলায় জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ অনেক কমে গেছে। পটুয়াখালীতে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ মিলছে গড়ে মাত্র ৮৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে চাহিদার মাত্র ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে এবং অবধারিতভাবেই ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তিনি আশা ব্যক্ত করেন, চলমান জ্বালানি সংকট কাটলে এবং দেশের বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু হলে উপকূলীয় অঞ্চলের এই ভোগান্তি কিছুটা লাঘব হবে।
মন্তব্য