কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ফের অপরাধচক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তাণ্ডবে এক স্থানীয় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। শুক্রবার দুপুরে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৪ নম্বর আশ্রয়শিবিরের সি-২ ব্লকের একটি মসজিদের সামনে এ ঘটনা ঘটে। আহত যুবকের নাম ওবাইদুল হক (৩০)। তিনি পালংখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চোরখোলা গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওবাইদুল হক পেশায় একজন ব্যবসায়ী। আশ্রয়শিবিরের ভেতরের ব্যবসায়ীদের সাথে তাঁর নিয়মিত লেনদেন ছিল। ঘটনার দিন তিনি ১৪ নম্বর আশ্রয়শিবিরের সি-২ ব্লকের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে যান। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় পূর্বে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে তাঁর তর্কাতর্কি শুরু হয়। ইউনুস স্থানীয়ভাবে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরএসও)-র ক্যাম্প কমান্ডার হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দোকানের বকেয়া টাকা লেনদেন এবং পুরনো পারিবারিক ও ব্যবসায়িক বিরোধ থেকে এই ঝগড়ার সূত্রপাত। একপর্যায়ে ইউনুসের সংকেতে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সশস্ত্র দল ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয়। তাদের মধ্য থেকে একজন ওবাইদুলকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালায়। গুলির আঘাতে ওবাইদুল মাটিতে লুটিয়ে পড়লে অপরাধীরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে আশপাশের গহিন জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়।
গুলিটি ওবাইদুলের ডান পায়ের গোড়ালিতে বিদ্ধ হয়েছে। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সীমান্তহীন ডাক্তার (এমএসএফ) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে সন্ধ্যায় তাঁকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার বিচার ও নিরাপত্তা দাবি করে আহত ওবাইদুলের বড় ভাই জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমার ভাই শুধু নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হচ্ছিল। সেই সময় প্রকাশ্য দিবালোকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলো। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।”
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় উখিয়া থানা পুলিশ এবং আশ্রয়শিবিরের সুরক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে। ঘটনার নেপথ্য কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় এক বাংলাদেশি নাগরিক কেন আশ্রয়শিবিরের ভেতরের মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন এবং কার কার সাথে তাঁর আর্থিক লেনদেন ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামলায় জড়িতদের ধরতে ইতিমধ্যে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে।
৮ এপিবিএনের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ঘটনার পর থেকে ১৪ নম্বর আশ্রয়শিবিরসহ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত টহল বসানো হয়েছে এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এদিকে আশ্রয়শিবিরে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অবৈধ অস্ত্রের অবাধ ব্যবহারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, আশ্রয়শিবিরগুলোতে অবৈধ অস্ত্রের আনাগোনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, স্থানীয় বাংলাদেশি অধিবাসীদের নিরাপত্তার জন্যও চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবিলম্বে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি জোর দাবি জানান।



