খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৫০ পিএম
তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে টানা ২৬ দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সবকটি ইউনিট অচল হয়ে পড়ায় এবং পাশাপাশি অঞ্চলের দুটি বেসরকারি কেন্দ্রে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসায় পুরো ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ লোডশেডিং। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় একদিকে বাসাবাড়িতে তৈরি হয়েছে পানির তীব্র সংকট, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার দৈনন্দিন কার্যক্রম।
তবে এই জাতীয় জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের পেছনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দায়ী করেছেন ময়মনসিংহ আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদ। এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি দাবি করেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খনিজ সম্পদ ও জ্বালানি সরবরাহের সংক্রান্ত চুক্তি করেছিলেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ না পাওয়ায় দেশে হঠাৎ জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তাঁদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে। অবশ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গ্যাস সরবরাহের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করছে কর্তৃপক্ষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো এবং সম্ভাব্য শিল্পাঞ্চলে নির্বিঘ্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় আরপিসিএল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে এবং সঞ্চালন সংস্থা গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) গ্যাস পাইপলাইন বসায়। কিন্তু উদ্বোধনের পর থেকেই প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে কেন্দ্রটি চরম সক্ষমতার সংকটে ভোগে। ২০০৭ সালের পর দেশে সার্বিক গ্যাস সংকট বাড়লে এই কেন্দ্রের উৎপাদনও তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে এটি মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াটের বেশি দিতে পারছিল না। প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় কেন্দ্রটির ক্রমশ অবনতির চিত্র। ২০২১-২২ অর্থবছরে কেন্দ্রটির প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে নেমে আসে মাত্র ৪৫ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাসভিত্তিক উৎপাদন কোনো কোনো সময় ৪০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। সবশেষ গ্যাস সরবরাহ শূন্যে ঠেকায় গত ২৬ দিন ধরে কেন্দ্রটি অচল হয়ে আছে।
বর্তমানে এই বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় সূত্রগুলো জেলা শহরে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের দাবি করলেও বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। নগরবাসী জানাচ্ছেন, প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। আর গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও করুণ, সেখানে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে।
বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে সাধারণ মানুষের জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, ব্যাহত হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া। অনেক এলাকায় ইলেকট্রিক মোটরের সাহায্যে পানি তোলা সম্ভব না হওয়ায় খাবার পানি ও গৃহস্থালি কাজের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ছোট-বড় পোল্ট্রি ও ডেইরি খামারিরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি রান্নার গ্যাসের জোড়া সংকটে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ দ্রুত এই অচলাবস্থা নিরসনের দাবি জানাচ্ছেন।
মন্তব্য