খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৩ পিএম
গান গাওয়ার স্বতন্ত্র ঢং, আকর্ষণীয় পোশাক, মঞ্চ মাতানো নাচ আর অনন্য তারকাসংস্কৃতি দিয়ে গোটা বিশ্বকে নতুন এক উন্মাদনায় ভাসিয়েছিলেন এলভিস প্রিসলি। আজ ১৬ আগস্ট, সংগীতজগতের এই প্রবাদপুরুষের ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৭ সালের এই দিনে মাত্র ৪২ বছর বয়সে কোটি কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে না-ফেরার দেশে চলে যান ‘দ্য কিং’। অকালপ্রয়ানের প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও পপ সংস্কৃতিতে তাঁর রাজত্ব ও প্রভাব এখনো আগের মতোই অমলিন। তবে এত অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা অর্জন করার পরও প্রিসলি জীবনে কেন উত্তর আমেরিকার বাইরে অন্য কোনো দেশে কনসার্ট করেননি, তা সংগীতাঙ্গনে আজও এক ঐতিহাসিক রহস্য।
ষাটের দশকে যখন পপ ও রক সংগীতের জোয়ার বইছিল, তখন ইউরোপ, এশিয়া কিংবা অস্ট্রেলিয়ার প্রমোটাররা এলভিসকে নিজ দেশে নিয়ে কনসার্ট আয়োজনের জন্য মুখিয়ে ছিলেন। যেকোনো অঙ্কের অর্থ ঢালতে রাজি ছিলেন আন্তর্জাতিক আয়োজকেরা। কিন্তু এত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত পেরিয়ে তাঁর গান খুব একটা বাইরে পৌঁছায়নি। গোটা ক্যারিয়ারে ২৪০টির বেশি শহরে ১ হাজার ৬০০টিরও বেশি একক কনসার্ট করলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে প্রিসলির লাইভ শো হয়েছিল মাত্র পাঁচটি, আর তা-ও প্রতিবেশী দেশ কানাডায়। ১৯৫৭ সালে ক্যারিয়ারের সোনালী সময়ে টরন্টো, অটোয়া ও ভ্যাঙ্কুভারে আয়োজিত হয় সেসব ঐতিহাসিক কনসার্ট। সংগীতের বাইরে আমেরিকান সেনাবাহিনীতে চাকরির সুবাদে স্কটল্যান্ড ও ফ্রান্স হয়ে পশ্চিম জার্মানিতে কিছুদিন অবস্থান করা ছাড়া বিশ্বভ্রমণের কোনো সুযোগ পাননি তিনি।
অথবা বলা ভালো, তাঁকে ভ্রমণের সেই সুযোগটি দেওয়া হয়নি। সেই সময়ের অন্যান্য প্রভাবশালী পপ তারকা—যেমন লিটল রিচার্ড, বিল হ্যালি, জেরি লি লুইস কিংবা বাডি হলি—ততদিনে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সফল ট্যুর সম্পন্ন করেছিলেন। প্রিসলির মনেও বিশ্বভ্রমণের গভীর সুপ্ত ইচ্ছা ছিল। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানে গিয়ে পারফর্ম করার জন্য তিনি মুখিয়ে ছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই ইচ্ছার পথে সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরই প্রতাপশালী ম্যানেজার, ‘কর্নেল’ টম পার্কার।
প্রিসলির ক্যারিয়ার সূচনা থেকে শুরু করে জীবনাবসান পর্যন্ত সার্বিক নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় ছিলেন এই পার্কার। এমনকি প্রিসলির সেনাবাহিনীতে যোগদান থেকে শুরু করে প্রিসিলা বোলিউর সঙ্গে বিয়ে—সবকিছুকেই নিজের ব্যবসায়িক প্রচারণার অংশ বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। এর বিনিময়ে প্রিসলির মোট উপার্জনের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পকেটে পুরতেন পার্কার। বিশ্বস্ত সহযোগী জেরি শিলিংয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লাস ভেগাস হিলটনে এক গভীর রাতের বৈঠকে প্রিসলি যখন বিদেশে শো করার ব্যাপারে নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানান, তখন পার্কার স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘তুমি বিদেশে গেলে আমি তোমার সঙ্গে যাব না।’ জবাবে ক্ষুব্ধ এলভিস তাঁকে তাৎক্ষণিক বরখাস্তের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন সংগীত ব্যবসায় পার্কারের প্রভাব এতই ভয়াবহ ছিল যে তাঁকে ডিঙিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক প্রমোটার এলভিসের সঙ্গে কাজ করার সাহস পাননি।
কিন্তু বিশ্বখ্যাত এই গায়ককে কেন নিজ দেশের গণ্ডির মধ্যে বন্দি করে রাখতে চেয়েছিলেন পার্কার? কেনই বা ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা সৌদি আরব সরকারের দেওয়া মিলিয়ন ডলারের লোভনীয় অফার এক মুহূর্তে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন? এর পেছনের মূল রহস্য লুকিয়ে ছিল পার্কারের গোপন ও রহস্যময় অতীতে।
পার্কার নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার হান্টিংটনে জন্ম নেওয়া মার্কিন নাগরিক এবং সম্মানসূচক ‘কর্নেল’ উপাধিতে ভূষিত সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করতেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন নেদারল্যান্ডসের ব্রেদা শহরে ১৯০ ৯ সালে জন্ম নেওয়া এক ডাচ নাগরিক, যার আসল নাম ছিল আন্দ্রেয়াস কর্নেলিস ভ্যান কুইক। ১৯২৯ সালে অবৈধ উপায়ে নথি জাল করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করার পর তিনি আর কখনোই মার্কিন নাগরিকত্ব পাননি।
পার্কারের এই আইনি জটিলতাই মূলত এলভিস প্রিসলির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দিয়েছিল। তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, পাসপোর্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে গেলে পুনরায় ফেরার সময় নথিপত্র পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হতো। বৈধ ভিসা ও পাসপোর্ট না থাকায় আমেরিকায় ঢোকার মুখে নিজের অবৈধ অনুপ্রবেশ ধরা পড়ার প্রচণ্ড আতঙ্কে ভুগতেন পার্কার। অন্যদিকে কানাডায় সীমান্ত পারাপারে পাসপোর্টের কড়াকড়ি না থাকায় কেবল সেখানেই গায়ককে নিয়ে যাওয়ার সাহস পেয়েছিলেন তিনি।
মন্তব্য