খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৫ এএম
গাজা উপত্যকায় প্রতি রাতে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে বেছে বেছে গুপ্তহত্যার এক ভয়াবহ ও উসকানিমূলক বার্তা দিয়েছেন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। তার মতে, কেবল ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি সৃষ্টি করা ব্যক্তিদের ওপরই নয়, বরং সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ওপরও সমানভাবে এই পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালোনো উচিত। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাসহ একাধিক ফিলিস্তিনি গণমাধ্যমে বেন-গভিরের এই উগ্র বক্তব্য চরম বিতর্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সাবেক ইসরায়েলি জিম্মি রোম ব্রাসলাভস্কির সাথে এক পডকাস্টে কথা বলার সময় বেন-গভির ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার দীর্ঘদিনের বর্ণবাদী মনোভাব উগরে দেন। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন, গাজার সাধারণ মানুষ ‘বেঁচে থাকার যোগ্য নয়’ এবং তাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করার কোনো কারণ নেই। গাজায় বর্তমান সামরিক হামলার তীব্রতা কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে তিনি জানান, সক্রিয় হুমকির বাইরে গিয়েও বিস্তৃত পরিসরে এই টার্গেটেড কিলিং বা গুপ্তহত্যা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে বেন-গভিরের এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। যদিও সেনাবাহিনীর ওপর তার সরাসরি একক আদেশ জারির ক্ষমতা নেই, তবুও নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তার মতামত উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। ওই সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়েও উসকানিমূলক কথা হয়। সাবেক জিম্মি ব্রাসলাভস্কি ফিলিস্তিনি বন্দিদের নিজ হাতে হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে বেন-গভির তাকে সব ধরনের সুযোগ ও সহযোগিতা করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন।
বেন-গভির ও গাজা পরিস্থিতি সংক্রান্ত মূল তথ্যাবলি
গুপ্তহত্যার প্রস্তাব: প্রতিদিন রাতে ৩০ থেকে ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যার আহ্বান।
নিশানার পরিধি: প্রত্যক্ষ হুমকির পাশাপাশি সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা সম্প্রসারণের দাবি।
ফিলিস্তিনিদের মর্যাদা: ফিলিস্তিনিরা ‘মানুষ নয়’ এবং ‘বেঁচে থাকার যোগ্য নয়’ বলে বিতর্কিত মন্তব্য।
নেতানিয়াহুর সমালোচনা: গাজায় সামরিক অভিযান কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা।
ফিলিস্তিনি বন্দি নীতি: বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দিতে সাধারণ ইসরায়েলিদের সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
বসতি স্থাপন পরিকল্পনা: গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে সরিয়ে নতুন করে ইসরায়েলি বসতি গড়ার ডাক।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: জোরপূর্বক উচ্ছেদকে ‘জাতিগত নির্মূল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
হতাহতের পরিসংখ্যান: তথাকথিত যুদ্ধবিরতির সময়ও গাজায় ১,২৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত।
কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: চরমপন্থি আচরণের কারণে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশের নিষেধাজ্ঞা।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: আগামী ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচনকে ঘিরে ডানপন্থি ভোটব্যাংক জোরদার করার কৌশল।
উগ্র জাতীয়তাবাদী ও চরমপন্থি কাহানিস্ট আন্দোলনের সাথে কৈশোর থেকেই যুক্ত বেন-গভির দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও মানবিক জীবনযাত্রার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে সরিয়ে পুরো অঞ্চল দখলের বিষয়ে তার ‘পুরো গাজাই আমাদের’ মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বা জাতিগত নির্মূলের শামিল। ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক প্রতিরোধ এবং বৈশ্বিক নিন্দা তোয়াক্কা না করে আসন্ন নির্বাচনের রাজনৈতিক সুবিধা নিতেই বেন-গভির গাজায় এই বর্বরতা অব্যাহত রাখার উসকানি দিয়ে যাচ্ছেন।
মন্তব্য