খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই আগস্ট ২০২৬, ২:২৯ পিএম
নাতনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে—এমন ভুল খবর শুনে তীব্র শোকে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন ৯০ বছর বয়সী খাইরুন নেছা। অথচ যে নাতনির মৃত্যুর খবর শুনে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন, কিছুক্ষণ পর তাকেই জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় খুঁজে পান স্বজনেরা। কিন্তু সেই স্বস্তির খবর দাদির কাছে পৌঁছানোর আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা। নাতনিকে ফিরে পেলেও দাদিকে আর ফিরে পাননি পরিবারের সদস্যরা।
রোববার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের উত্তর আলামপুর গ্রামের সুতা ব্যাপারী বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত খাইরুন নেছা ওই বাড়ির বদিউর রহমানের স্ত্রী।
পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোববার বিকেলে সিলোনীয়া বাজার এলাকায় একটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সিলোনীয়া উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী নিহত হয়। দুর্ঘটনার পর একই বিদ্যালয়ের ছাত্রী জান্নাতুল ফাহিমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সে খাইরুন নেছার নাতনি হওয়ায় স্বজনদের মধ্যে দ্রুত উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্ঘটনায় একজন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার খবর এবং নাতনিকে খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি একপর্যায়ে পরিবারের কাছে এমন ধারণা তৈরি করে যে নিহত শিক্ষার্থীটি হয়তো জান্নাতুল ফাহিম। নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার আগেই নাতনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও শোকাবহ হয়ে ওঠে।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, নাতনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে—এমন খবর শোনার পর খাইরুন নেছা প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পান। তিনি অচেতন হয়ে ঘরের ভেতর লুটিয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা তখনও জানতেন না যে, জান্নাতুল ফাহিম আসলে জীবিত এবং তাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা সফল হতে চলেছে।
এদিকে স্বজনেরা খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে জান্নাতুল ফাহিমকে সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় খুঁজে পান। নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে তারা বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। কিন্তু পথে তারা জানতে পারেন, দাদি খাইরুন নেছা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে সেখানে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসক জানান।
নিহতের ছেলে স্বপন মিয়া বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি সিলোনীয়া বাজারে ছুটে যান এবং সেখানে নিজের মেয়েকে খুঁজতে থাকেন। দীর্ঘ সময় খুঁজেও মেয়েকে না পাওয়ায় তিনি বাড়িতে বিষয়টি জানান। তখন তার মা নাতনির মৃত্যুর খবর শুনে প্রচণ্ড শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে মেয়েকে জীবিত অবস্থায় ফিরে পেলেও মাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. ইফরাদ খন্দকার জানান, ওই বৃদ্ধাকে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। চিকিৎসকের ধারণা, তীব্র মানসিক আঘাতের পর নিজ বাড়িতেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারেন।
ঘটনাটি পরিবারটির জন্য এক বিরল ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি দুর্ঘটনার খবর, নিখোঁজ নাতনিকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভুল ধারণা এবং যাচাই না করা মৃত্যুর গুজব মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারকে শোকের মধ্যে ঠেলে দেয়। পরে যখন জানা গেল নাতনি জীবিত, তখন স্বস্তির বদলে পরিবারকে মুখোমুখি হতে হয় আরও বড় শোকের—প্রিয় দাদিকে হারানোর।
এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, দুর্ঘটনা বা নিখোঁজের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার আগে কোনো মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে পরিবারের প্রবীণ ও অসুস্থ সদস্যদের ক্ষেত্রে আকস্মিক ও ভুল সংবাদ ভয়াবহ মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে গুজবের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের কাছ থেকে তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
মন্তব্য