চলন্ত ট্রেনে এক নারী যাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ ঘিরে ভয়াবহ তাণ্ডবের সাক্ষী হলো ‘অভিযাত্রী কমিউটার’। গোপালগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী এই ট্রেনে দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে স্থানীয় একদল বখাটে যুবক। বৃষ্টির মতো পাথর নিক্ষেপের কারণে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ট্রেনের বেশ কয়েকটি জানালার কাঁচ। আহত হয়েছেন অন্তত একজন যাত্রী। গোটা যাত্রাপথে সাধারণ যাত্রীদের মাঝে বিরাজ করছিল চরম আতঙ্ক ও প্রাণভয়।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীদের বিবরণ অনুযায়ী, রোববার (১৬ আগস্ট) রাতে ট্রেনটি গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পথে ট্রেনের ভেতরেই এক নারী যাত্রীকে লক্ষ্য করে অশালীন মন্তব্য ও উত্ত্যক্ত করতে শুরু করে কয়েকজন বখাটে। বিষয়টি সাধারণ যাত্রীদের নজরে এলে তারা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। এ নিয়ে উত্ত্যক্তকারী ও প্রতিবাদী যাত্রীদের মধ্যে তুমুল বাগবিতণ্ডা এবং একপর্যায়ে হাতাহাতির উপক্রম হয়। যাত্রীদের তোপের মুখে বখাটেরা পিছু হটলেও তারা মুঠোফোনে স্থানীয় সহযোগীদের খবর দেয়।
রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে ট্রেনটি যখন কাশিয়ানী উপজেলার মহেশপুর রেলস্টেশনে পৌঁছায়, তখন সেখানে আগে থেকেই লাঠিসোঁটা ও পাথর হাতে ওত পেতে ছিল স্থানীয় যুবকদের একটি বিশাল দল। ট্রেনটি স্টেশনে থামার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তারা হামলা চালায়। প্রতিবাদী যাত্রীদের টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে মারধরের উদ্দেশ্যে তারা ট্রেনের বগিতে ওঠার জোর চেষ্টা চালায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সাধারণ যাত্রী ও রেলকর্মীরা দ্রুত ভেতর থেকে ট্রেনের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দেন।
ভেতরে ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে বাইরে থাকা ক্ষুব্ধ জনতা ট্রেনের ওপর বৃষ্টির মতো পাথর ছুড়তে শুরু করে। বড় বড় পাথরের আঘাতে ট্রেনের জানালার কাঁচ ভেঙে ভেতরে পড়তে থাকে। নারী ও শিশু যাত্রীরা আতঙ্কে কান্নাকাটি শুরু করেন। পাথরের আঘাতে এক যাত্রী গুরুতর আহত হন। প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই ট্রেনের মেঝেতে শুয়ে পড়েন। চারপাশের এই ভীতিকর পরিস্থিতিতে চালক দ্রুত ট্রেনটি ছেড়ে দিয়ে যাত্রীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন।
তবে আতঙ্কের এখানেই শেষ ছিল না। ট্রেনটি যখন ফরিদপুরের নগরকান্দা স্টেশনে পৌঁছায়, তখন সেখানেও পুনরায় হামলার ঘটনা ঘটে। স্টেশন এলাকায় ট্রেনটি লক্ষ্য করে আবারও পাথর ছোড়া হয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, নিরাপত্তার অভাবে মহেশপুর ও নগরকান্দা স্টেশন থেকে অপেক্ষমাণ অনেক যাত্রী ট্রেনে উঠতে পারেননি। এমনকি যারা গন্তব্যে নামতে চেয়েছিলেন, তারাও ভয়ে ট্রেন থেকে নামার সাহস পাননি। বাধ্য হয়ে খুব সামান্য সময়ের জন্য যাত্রাবিরতি দিয়ে ট্রেনটি দ্রুত ঢাকার উদ্দেশে স্টেশন ত্যাগ করে।
পুরো ঘটনায় ট্রেনের কর্মী ও যাত্রীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ট্রেনের পরিচালক বিজয় বিশ্বাস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ হামলায় আমি মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত। স্টেশনে ট্রেন ও যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমি জরুরি ভিত্তিতে প্রশাসনিক সহায়তা চেয়েছি।”
একদিকে ট্রেনের পরিচালক ও যাত্রীরা যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বহীনতা জনমনে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এত বড় একটি হামলার বিষয়ে রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি চরম উদাসীনতার সঙ্গে জানান, এ ধরনের কোনো হামলার ঘটনা তার জানা নেই। রেলপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং স্টেশনগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রোববারের এই ঘটনা নতুন করে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
মন্তব্য