নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা সংবাদ সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে দুই ক্যাম্পাস সাংবাদিক হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও মুছে দেওয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হল এবং পকেট গেট-সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অভিযোগের মুখে পড়া দুই সাংবাদিক হলেন দৈনিক মানবজমিনের নোবিপ্রবি প্রতিনিধি মাহী ছিদ্দীকী সিয়াম এবং দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদের নোবিপ্রবি প্রতিনিধি মেহেদী হাসান।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, সংঘর্ষের খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন। একপর্যায়ে কয়েকজন ছাত্রদল কর্মী তাঁদের ঘিরে ধরেন। তাঁদের মোবাইল ফোন নেওয়া হয় এবং ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলার জন্য চাপ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ধাক্কা ও শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
অভিযোগে ছাত্রদল কর্মী হিসেবে বাংলা বিভাগের ১৭তম আবর্তনের আতিক হাসান, অর্থনীতি বিভাগের ১৮তম আবর্তনের তানভীর ভূঁইয়া, আইন বিভাগের ১৯তম আবর্তনের খান মোহাম্মদ রোম্মান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১৮তম আবর্তনের ফাইসাল হোসাইন এবং কৃষি বিভাগের ১৮তম আবর্তনের এম কে এম আকরাম খানের নাম এসেছে।
মাহী ছিদ্দীকী সিয়ামের ভাষ্য অনুযায়ী, হলের ছাদসংলগ্ন এলাকা থেকে মারামারি, উচ্চবাচ্য ও চিৎকারের শব্দ শুনে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে কিছুক্ষণ পর আলো নিভে গেলে তিনি আলো জ্বালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় আইন বিভাগের রোম্মানসহ একজন তাঁকে ধাক্কা দেন বলে তাঁর অভিযোগ।
সিয়াম জানান, পরে তিনি দেখতে পান ছাত্রদলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকপন্থি এবং সিনিয়র সহসভাপতিপন্থি নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলছে। একই সময় সমন্বয়ক জাহিদকে ধাওয়া করে হল থেকে বের করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পকেট গেটের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ঘটনাটি অনুসরণ করে তিনি ভিডিও ধারণ করছিলেন।
সিয়ামের অভিযোগ, তখন রোম্মান, আতিক, তানভীর ও ফাইসাল তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেন। রোম্মান তাঁকে ধাক্কা দিয়ে হাতে ও ঘাড়ে আঘাত করেন এবং মোবাইল ফোন দেখতে চান। পরে ফোনটি আনলক করতে বাধ্য করা হয় এবং সেখানে থাকা সংঘর্ষের ভিডিও মুছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভিডিওটি অন্য কোথাও পাঠানো হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ফোনের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাপও পরীক্ষা করা হয়। সবকিছু মুছে দেওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে দিয়ে ঘটনা নিয়ে সংবাদ না করার কথা বলা হয়।
অন্যদিকে মেহেদী হাসানের অভিযোগ, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির সময় তিনি ও তাঁর সহকর্মী সিয়াম সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় ছাত্রদল কর্মী ফাইসাল হোসাইন তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন এবং ভিডিও ধারণ বন্ধ করতে বলেন। পরে তাঁদের দুজনকে ধাক্কা দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এর আগে মঙ্গলবার গভীর রাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হলে ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকপন্থি এবং সিনিয়র সহসভাপতিপন্থি নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতির তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।
ঘটনার পর নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। সংগঠনটির সভাপতি নাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত দুজন ক্যাম্পাস সাংবাদিকের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। তাঁরা দুজনই সাংবাদিক সমিতির সদস্য। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি সাংবাদিকদের ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হোসেন বলেন, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নন এবং বিস্তারিত জানেন না। তবে বিষয়টি ভালোভাবে খোঁজ নিয়ে পরে জানাতে পারবেন বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ এফ এম আরিফুর রহমান বলেন, বিষয়টি হলের প্রভোস্ট বডির সদস্যদের জানানো হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও অবহিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনসার সদস্যদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রক্টরিয়াল বডির সভা আহ্বান করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিক সমিতির সভাপতির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে উল্লেখ করে প্রক্টর বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

