বাংলাদেশের কাছে ডারউইনে ৯ উইকেটের বড় পরাজয়ের পর পরবর্তী টেস্টের জন্য স্কোয়াডে পরিবর্তন এনেছে অস্ট্রেলিয়া। ব্যর্থতার পর ওপেনিং জুটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে স্বাগতিকদের। বাদ পড়েছেন জেক ওয়েদারাল্ড। তাঁর জায়গায় দলে ফিরেছেন অভিজ্ঞ ব্যাটার ম্যাথু রেনশ। ম্যাকেতে ট্রাভিস হেডের সঙ্গে রেনশকেই ইনিংস উদ্বোধন করতে দেখা যেতে পারে।
এপ্রিল মাসে জাতীয় চুক্তিতে জায়গা পাওয়ার পর ডারউইন টেস্টটিই ছিল ওয়েদারাল্ডের প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের ম্যাচটি তাঁর জন্য মোটেও সুখকর হয়নি। প্রথম ইনিংসে ২৩ রান করে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর সংগ্রহ শূন্য। নিজের ব্যাটে লেগে বল স্টাম্পে আঘাত করায় অস্বাভাবিকভাবে বোল্ড হন এই বাঁহাতি ব্যাটার।
দুই ইনিংসের ব্যর্থতার ফলে আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর মোট ১২ ইনিংসে ব্যাটিং গড় দাঁড়িয়েছে ২০.৩৬। এত কম নমুনায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা কঠিন হলেও অস্ট্রেলিয়ার পরবর্তী ম্যাচের জন্য নির্বাচকেরা ঝুঁকি না নিয়ে বিকল্প পথে হাঁটছেন।
ওয়েদারাল্ডকে দলে রাখার পেছনে অবশ্য যথেষ্ট যুক্তি ছিল। অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়ার ৪-১ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের সময় তাঁর পারফরম্যান্স এবং ট্রাভিস হেডের সঙ্গে তাঁর সমন্বয় প্রশংসা পেয়েছিল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এলবিডব্লিউ ও বোল্ড হওয়ার প্রবণতা কমাতে নিজের ব্যাটিং কৌশলেও পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি। ব্যাটিংয়ের সময় দাঁড়ানোর অবস্থান ও শরীরের নড়াচড়ায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডও সেই পরিবর্তনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, ওয়েদারাল্ডের ব্যাটিংয়ে কারিগরি পরিবর্তন এলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেটি দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা বিচার করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ পাওয়া যায়নি। ডারউইনে মাত্র দুই ইনিংসের পারফরম্যান্স দিয়ে সেই পরিবর্তনের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করাও কঠিন।
তবে অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। সেই জায়গায় রেনশকে সবচেয়ে স্বাভাবিক বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত মৌসুমে শেফিল্ড শিল্ডে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করা এই ওপেনার ১০ ইনিংসে তিনটি শতক করেন এবং প্রায় ৫০ গড়ে রান সংগ্রহ করেন। ম্যাকেতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও তাঁর দুটি শতক রয়েছে। ফলে ওই মাঠের পরিবেশ তাঁর জন্য পুরোপুরি অপরিচিত নয়।
রেনশর সবচেয়ে বড় শক্তি অবশ্য তাঁর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। তিনি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে এখন পর্যন্ত ১৪টি টেস্ট খেলেছেন। যদিও তাঁর সর্বশেষ টেস্ট ছিল প্রায় তিন বছর আগে দিল্লিতে। সেই ম্যাচে তিনি ওপেনিংয়ের বদলে মিডল অর্ডারে ব্যাট করেছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও জাতীয় দলের হয়ে সুযোগ পাওয়ায় ম্যাকেতে তাঁর সামনে নিজেকে প্রমাণ করার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার হাতে বিকল্প হিসেবে রয়েছেন জশ ইংলিসও। ৩১ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার সাধারণত শেফিল্ড শিল্ডে পাঁচ নম্বর বা তার নিচে ব্যাট করেন। তবে টপ অর্ডারে খেলার সক্ষমতা যে তাঁর আছে, তার প্রমাণও রয়েছে। গত নভেম্বরে ইংল্যান্ড লায়ন্সের বিপক্ষে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের হয়ে ওপেন করে তিনি ৪০ এবং অপরাজিত ১২৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। তাই প্রয়োজন হলে তাঁকেও ওপেনিংয়ে তুলে আনা হতে পারে।
লাবুশেন নিয়েও বাড়ছে প্রশ্ন
ওপেনিংয়ের পাশাপাশি তিন নম্বর পজিশন নিয়েও অস্ট্রেলিয়ার চিন্তার কারণ রয়েছে। ডারউইনে মার্নাস লাবুশেন করেন ১ ও ৩১ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩১ রান করার সময় তিনি বেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রিত ব্যাটিং করলেও বড় স্কোরে রূপ দিতে পারেননি।
লাবুশেনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও স্বস্তি দিচ্ছে না। প্রায় তিন বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ব্যাট থেকে কোনো শতক আসেনি। সর্বশেষ ৪২ টেস্ট ইনিংসে তাঁর ব্যাটিং গড় ২৫.২৩। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের তিন নম্বর ব্যাটারের কাছ থেকে যে ধরনের ধারাবাহিকতা প্রত্যাশিত, সেই মানদণ্ডে এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়।
ম্যাকডোনাল্ড অবশ্য এখনই লাবুশেনকে বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দেননি। বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে আউট হওয়ার আগে তাঁর ব্যাটিংয়ের কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন কোচ। তাঁর মতে, লাবুশেন ভালোভাবে নড়াচড়া করছিলেন, পায়ের কাছাকাছি আসা বল নিয়ন্ত্রণে খেলছিলেন এবং সোজা ব্যাটে শট নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
কিন্তু ক্রিকেটে শেষ হিসাবটা হয় রানের। ৩১ রান দিয়ে একটি ভালো শুরু দেখানো গেলেও সেটিকে বড় ইনিংসে পরিণত করতে না পারার বিষয়টি অস্ট্রেলিয়া শিবিরের নজর এড়াচ্ছে না। ম্যাকডোনাল্ডও স্বীকার করেছেন, লাবুশেনের রানের ঘাটতি রয়েছে এবং সেই সমস্যা নিয়ে তিনি নিজেও সচেতন।
বাংলাদেশের বিপক্ষে হার তাই অস্ট্রেলিয়ার জন্য শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়; ব্যাটিং অর্ডারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়ে নতুন করে ভাবার কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওপেনিংয়ে রেনশর প্রত্যাবর্তন, ইংলিসের সম্ভাব্য বিকল্প ভূমিকা এবং লাবুশেনের ফর্ম—সব মিলিয়ে ম্যাকেতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং সমন্বয়ই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
বাংলাদেশের পেসাররা ডারউইনে যে চাপ তৈরি করেছিলেন, তার প্রভাব অস্ট্রেলিয়ার দল নির্বাচনেও পড়েছে। পরবর্তী ম্যাচে স্বাগতিকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নতুন ব্যাটিং সমন্বয়কে দ্রুত কার্যকর করা। আর রেনশর সামনে থাকবে দীর্ঘ বিরতির পর টেস্ট দলে ফেরার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনিং সমস্যার সমাধান দেওয়ার পরীক্ষা।


