আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ডা. খায়রুল ইসলাম মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। শুক্রবার ভোরে রাজধানীর কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
ওয়াটারএইডের যোগাযোগ বিভাগের সমন্বয়কারী প্লাবন গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সংস্থাটির সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর খায়রুল ইসলামকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।
খায়রুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ম তামিম জানান, তাঁর ছেলে অর্ক অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরছেন। ছেলের দেশে ফেরার পর শনিবার বাদ আছর রাজধানীর গুলশানের আজাদ মসজিদে খায়রুল ইসলামের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে তাঁকে রায়েরবাজারে দাফন করা হতে পারে।
খায়রুল ইসলাম শুধু জনস্বাস্থ্য ও পানি-স্যানিটেশন খাতের একজন পেশাজীবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন লেখক ও গবেষকও। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে তিনি জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে স্নাতকোত্তর শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনেও উচ্চশিক্ষা নেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাব্যবস্থা, পানি, পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। এসব বিষয়ে তাঁর একাধিক বই ও গবেষণাকর্ম দেশে-বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বিকাশ বিষয়ে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে তিনি সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি লেখাও দিয়েছেন। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশিত একটি গ্রন্থেও তাঁর অবদান ছিল। ‘মুজিবপিডিয়া’তেও তিনি স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে লিখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় চিকিৎসাসেবার ইতিহাস নিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্ম রয়েছে। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি লেখেন ‘মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাস’ বইটি। বইটি প্রকাশের আগে প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাঁরা এ বিষয়ে গবেষণা করেন। ২০২২ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী, হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার নানা দিকের ইতিহাস তুলে ধরার কারণে বইটি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণাকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
পানি, পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি—সমষ্টিগতভাবে যেসব বিষয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত—সেসব ক্ষেত্রেও খায়রুল ইসলামের দীর্ঘদিনের কাজ ছিল। ওয়াটারএইডের হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পানি ও স্যানিটেশন খাতের উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত সেবার প্রসারে তিনি কাজ করেছেন।
কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। চলতি আগস্ট মাসেই তাঁর এ পদ থেকে অবসর নেওয়ার কথা ছিল। অবসরের মাত্র কয়েক দিন আগে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
খায়রুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশনসহ সামাজিক নানা বিষয়ে নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তাঁর লেখায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা সমস্যা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের প্রধান হাসিন জাহান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, খায়রুল ইসলামের মরদেহ শুক্রবার বারডেম হাসপাতালের মরচুয়ারিতে নেওয়া হবে। অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ছেলে দেশে না ফেরা পর্যন্ত মরদেহ সেখানে রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
ব্যক্তিজীবনেও খায়রুল ইসলাম ছিলেন সজ্জন ও সদালাপী হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ পেশাগত জীবনে তিনি চিকিৎসা, গবেষণা, লেখালেখি এবং পানি ও স্যানিটেশন খাতের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কাজের বিস্তৃতি ছিল জনস্বাস্থ্য থেকে মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাস পর্যন্ত।
মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা শুরু করেন খায়রুল ইসলাম। পরে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে দেশের জনস্বাস্থ্য অঙ্গনের একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর মৃত্যুতে চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, গবেষণা ও পানি-স্যানিটেশন খাতে দীর্ঘদিনের এক কর্মমুখর অধ্যায়ের অবসান হলো।


