দেশের পক্ষে লড়াই করা নিভৃতচারী আইনজীবী তৌফীক নাওয়াজ

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, বাঁশিবাদক ও ক্রিকেটপ্রেমী তৌফীক নাওয়াজ আর নেই। ৭৬ বছর বয়সে মঙ্গলবার রাতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও লিভারের নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই আইনজীবী। ২০১৯ সালে স্ট্রোক করার পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়।

তৌফীক নাওয়াজ ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির স্বামী। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশান আজাদ মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বৃষ্টির মধ্যে বনানী কবরস্থানে বাবা আমিনর রহমানের কবরে তাকে দাফন করা হয়। পাশেই রয়েছে তার মা খায়রন নেছার কবর।

শৈশবের বন্ধু আইনজীবী ও রাজনীতিক মহসিন রশীদের স্মৃতিতে তৌফীক নাওয়াজ ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষ। তবে তার ব্যক্তিজীবনের নানা দিক ছিল সৃজনশীলতায় ভরা। ক্রিকেট খেলতেন নিয়মিত। বাঁশি বাজানোর প্রতি ছিল বিশেষ অনুরাগ। শুধু শখের পর্যায়েই নয়, একক বাঁশি বাজানোর অনুষ্ঠানও করেছেন তিনি।

মহসিন রশীদ জানান, তৌফীক নাওয়াজের পরিবারে বাঁশি বাজানোর ঐতিহ্য ছিল। তার বাবা আমিনর রহমানও বাঁশি বাজাতেন। পরবর্তী প্রজন্মে তার ছেলে তৌকীর নাওয়াজও বাঁশি বাজান।

ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে তৌফীক নাওয়াজের শিক্ষাজীবনের শুরু। তৃতীয় শ্রেণি থেকে তার সঙ্গে পড়েছেন মহসিন রশীদ। স্কুলজীবনের পর ঢাকায় পড়াশোনা শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য অক্সফোর্ডে যান। সেখানে আইনবিদ ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে তিনি ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে আইন পেশা শুরু করেন।

পেশাগত জীবনেও তৌফীক নাওয়াজের দক্ষতা ও নিষ্ঠার কথা স্মরণ করেছেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধুরা। মহসিন রশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইনগত বিষয়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়েও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে জানান তিনি।

তৌফীক নাওয়াজের মৃত্যুর পর তার সহপাঠী ও বন্ধুদের অনেকেই জানাজায় উপস্থিত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন মহসিন রশীদ, সৈয়দ আশরাফুল হক ও মনিরুল আলম। এক সহপাঠী নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাকে সৎ, ভালো ও মেধাবী মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন।

২০১৯ সালে স্ট্রোক করার পর থেকে তৌফীক নাওয়াজের শারীরিক সক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়। সর্বশেষ গত ২৭ মে স্বজনেরা তাকে হুইলচেয়ারে করে আদালত প্রাঙ্গণে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কারাবন্দি স্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে দেখা করেন।

স্বামীর শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য দীপু মনিকে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা ১৫ মিনিটে তাকে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ঢাকায় আনা হয়। সকাল সোয়া ৮টার দিকে তিনি কলাবাগানের বাসায় পৌঁছান।

এর কিছুক্ষণ পর তৌফীক নাওয়াজের মরদেহও কলাবাগানের বাসায় নেওয়া হয়। বাড়ির নিচের গ্যারেজে ফ্রিজার ভ্যানে রাখা হয় মরদেহ। সেখানে কয়েকজন ধর্মীয় ব্যক্তি কোরআন তেলাওয়াত করেন। বাড়ির চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার ছিল এবং প্রবেশকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বামীর মৃত্যুতে দীপু মনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তাকে সান্ত্বনা দিতে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনেরা বাসায় আসেন।

দুপুর সোয়া ১২টার পর তৌফীক নাওয়াজের মরদেহ নিয়ে ফ্রিজার ভ্যান গুলশানের আজাদ মসজিদের উদ্দেশে রওনা হয়। এর কিছুক্ষণ পর দীপু মনিকেও প্রিজন ভ্যানে করে সেখানে নেওয়া হয়। বাদ জোহর মসজিদে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার সময় তিনি প্রিজন ভ্যানেই ছিলেন।

জানাজা শেষে ভ্যান থেকে নেমে স্বামীর মরদেহ শেষবারের মতো দেখেন দীপু মনি। এ সময় সেখানে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। পরে তাকে আবার নিরাপত্তাবেষ্টিত অবস্থায় বনানী কবরস্থানে নেওয়া হয়।

বেলা পৌনে ৩টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে বাবা আমিনর রহমানের কবরে তৌফীক নাওয়াজকে দাফন করা হয়। এ সময় স্ত্রী দীপু মনি, মেয়ে দ্বীপান্বিতা নাওয়াজ, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। মেয়ে দ্বীপান্বিতা বাবার কবরে মাটি দেন।

দাফন শেষে বনানী কবরস্থান মসজিদের ইমাম মাওলানা ওমর ফারুকের নেতৃত্বে মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। দীপু মনি নিজেও স্বামীর জন্য দোয়া করেন। পরে তিনি নিজের বাবা এম এ ওয়াদুদের কবর জিয়ারত করেন। ওয়াদুদ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন।

স্বামীর দাফন ও বাবার কবর জিয়ারত শেষে দীপু মনিকে আবার প্রিজন ভ্যানে করে মুন্সীগঞ্জ কারাগারের উদ্দেশে নেওয়া হয়। বৃষ্টির মধ্যেই তাকে কারাগারে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। মুন্সীগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা নুরমহল আশরাফীর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিকাল ৫টা ৫৮ মিনিটে তিনি কারাগারে ফিরে যান।

ব্যক্তিজীবনে প্রচারের আড়ালে থাকা তৌফীক নাওয়াজের পরিচয় তাই কেবল একজন আইনজীবী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। আইন পেশার পাশাপাশি বাঁশি, ক্রিকেট ও দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আইনি লড়াইয়ে তার সম্পৃক্ততার কথা স্মরণ করছেন দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহকর্মীরা। তার শেষ বিদায়ের দিনও সেই নিভৃতচারী মানুষটির জীবন ও কর্মের নানা দিক উঠে আসে স্বজন ও বন্ধুদের স্মৃতিচারণে।

Tags :

ratul Khaborwala

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।