গ্যাস সংকটে নাইকোই মনে করিয়ে দিচ্ছে পুরোনো ইতিহাস

বাংলাদেশে গ্যাসের সংকট আবারও জনজীবন ও অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে। কোথাও বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কম, কোথাও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবার কোথাও সার কারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহ, দেশীয় অনুসন্ধান এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সংকটের দায় কার—তা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে শুধু সাম্প্রতিক কয়েক বছরের দিকে তাকালে চলবে না। দেশের গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার ইতিহাস বহু বছরের। সেই ইতিহাসে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র ও নাইকো বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

২০০৫ সালে সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে নাইকোর খনন কার্যক্রম চলার সময় পরপর দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যায় এবং গ্যাসক্ষেত্রের পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী ক্ষতির মুখে পড়ে। ঘটনাটি পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ আইনি ও আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ার জন্ম দেয়।

আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালের ২০২০ সালের দায় নির্ধারণী সিদ্ধান্তে প্রথম বিস্ফোরণের জন্য নাইকোকে দায়ী করা হয়। সিদ্ধান্তে বলা হয়, যৌথ উদ্যোগ চুক্তির আওতায় কোম্পানিটি তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে টেংরাটিলা দুর্ঘটনার দায় নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আইনি স্বীকৃতি পায়।

পরবর্তী সময়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগোয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গ্যাসের ক্ষতি, পরিবেশগত ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষতির জন্য বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে চূড়ান্ত অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রায় ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নির্দেশ পায়। বাংলাদেশের দাবির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ০১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এই মামলার গুরুত্ব অবশ্য শুধু ক্ষতিপূরণের অর্থমূল্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের স্বার্থ, চুক্তির শর্ত এবং সম্পদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

টেংরাটিলা চুক্তির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। নাইকোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যৌথ উদ্যোগ চুক্তি হয়েছিল ২০০৩ সালে, অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়। পরে ওই চুক্তিকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগ ওঠে। এসব বিষয় বাংলাদেশের আদালতের নথিতেও এসেছে। ফলে বর্তমান গ্যাস সংকট নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে অতীতের এই অধ্যায় পুরোপুরি বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।

একইভাবে শুধু অতীতের সরকারের ভুল দেখিয়েও বর্তমান সংকটের পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না। গত দেড় দশকে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধান, কূপ খনন, গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, ভূকম্পন জরিপ, পাইপলাইন সম্প্রসারণ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অবকাঠামো তৈরিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

দেশীয় গ্যাসের মজুত সীমিত এবং পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সঙ্গে কমতে পারে। ফলে নতুন অনুসন্ধান ও কূপ খনন জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান শর্ত। একই সঙ্গে গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো, সরবরাহের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনীতি। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হতে পারে এবং সার উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে। উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ায়।

তাই গ্যাস সংকটকে কেবল রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার সমাধান হবে না। বিএনপি যদি বর্তমান সরকারের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সেই প্রশ্ন তোলার অধিকার তাদের রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের নিজেদের সময়ের চুক্তি ও সিদ্ধান্তেরও জবাবদিহি থাকতে হবে। একইভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গ্যাস খাতে নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা যেমন করা যেতে পারে, তেমনি প্রয়োজনের তুলনায় অনুসন্ধান কম হওয়া, দেশীয় মজুতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।

কারণ গ্যাস কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং এর সঙ্গে দেশের মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্প, কৃষি ও অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাসের চাপ কমলে সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়ে। শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ কমলে উৎপাদন থেমে যায়। সার কারখানায় গ্যাসের ঘাটতি হলে কৃষির ওপরও তার প্রভাব পড়ে। এসব বাস্তবতা দলীয় পরিচয় মানে না।

সুতরাং বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের সমাধান করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা। কোথায় নতুন গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে, কতটি কূপ খনন প্রয়োজন, পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কীভাবে ধরে রাখা যাবে, আমদানি ও দেশীয় গ্যাসের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে—এসব প্রশ্নের বাস্তবভিত্তিক উত্তর প্রয়োজন।

নাইকো অধ্যায়ও সেই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিদেশি বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু বিনিয়োগের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা ও জবাবদিহির প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তির প্রতিটি শর্তে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করা এবং কোনো পক্ষ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আজকের গ্যাস সংকটের দায় নির্ধারণ করতে গিয়ে তাই ইতিহাসের একটি অংশ বেছে নেওয়া যথেষ্ট নয়। ২০০৯ সালের আগের সিদ্ধান্ত, পরবর্তী সরকারের উদ্যোগ, বর্তমান ব্যবস্থাপনা—সবকিছুকে একই ধারাবাহিকতায় বিচার করতে হবে।

কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো এক মেয়াদের সরকারের বিষয় নয়। একটি ভুল চুক্তির প্রভাব যেমন বহু বছর থাকতে পারে, তেমনি অনুসন্ধানে দেরি বা অবকাঠামো তৈরিতে ঘাটতির ফলও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বহন করতে হয়।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো কে কাকে দায়ী করছে, সেই বিতর্কের বাইরে গিয়ে গ্যাসের স্থায়ী সমাধান খোঁজা। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, বর্তমানের ঘাটতি মোকাবিলা করতে হবে এবং ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে হবে। তাহলেই রাজনৈতিক বিতর্কের বদলে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সামনে রেখে গ্যাস খাতকে আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।

Tags :

Shakib

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।