রংপুরে ৪ হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া আগামির হবু স্বামীর আবেগঘন স্ট্যাটাস ভাইরাল

‘চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব।’ বিয়ের মাত্র কয়েক দিন আগে হবু স্ত্রী আগামী চক্রবর্তীকে নির্মম হত্যাকাণ্ডে হারিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন অদিত কর। রংপুর কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী আগামীসহ একই পরিবারের চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় শোকের আবহের মধ্যেই অদিতের লেখা ওই বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

রোববার রাতে ‘কারমাইকেল কলেজ ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশনস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে আগামী ও অদিতের একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবির সঙ্গে অদিতের লেখা বার্তাটিও তুলে ধরা হয়। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমার জীবনের শেষ সম্বলটাও শেষ হয়ে গেল।’

হবু স্ত্রীকে উদ্দেশ করে অদিত আরও লেখেন, ‘এটা বুধবারের ছবি। খুব করে বলল সেদিন—“আমরা তো কখনো কাপল পিক তুলি নাই, চলো আজকে তুলি।” চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব।’

অদিতের এই বক্তব্য থেকে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক দিন আগেও আগামী ও তাঁর মধ্যে স্বাভাবিক সময় কাটছিল। বুধবার তাঁরা একসঙ্গে ছবি তুলেছিলেন। বিয়ের প্রস্তুতির মধ্যেই সেই ছবিই যে তাঁদের শেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে, তা তখন কেউই ভাবতে পারেননি।

আগামী চক্রবর্তী ও অদিত করের বিয়ের তারিখ আগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। দুই পরিবারেও চলছিল বিয়েকে ঘিরে প্রস্তুতি। নতুন জীবনে একসঙ্গে পথচলার অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান আগামী। একই ঘটনায় তাঁর বাবা, মা ও ভাইও নিহত হন।

শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে এবং মেয়ে আগামী চক্রবর্তী। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

স্বজনদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া না পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে স্বজনদের কাছ থেকে খবর পেয়ে শনিবার রাতে ওই বাড়িতে যায় পুলিশ। সেখানে তালাবদ্ধ অবস্থায় চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়।

ঘটনার পর রংপুরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে একই পরিবারের চার সদস্যের একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। কী কারণে এবং কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে মুগ্ধ দাস, ২৩, এবং সিদ্ধার্থ দাস, ১৯, নামে দুজনকে আটক করা হয়েছে। রোববার ভোরে তাঁদের আটক করা হয়।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। এরপর একে একে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

তবে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা এবং এর সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

চারজনের মৃত্যুতে পরিবারটির স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এর মধ্যে আগামী চক্রবর্তীর মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি মর্মান্তিক দিক—বিয়ের মাত্র কয়েক দিন আগে তাঁর জীবন থেমে যাওয়া। যে সময়ে নতুন সংসার শুরুর প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল, সেই সময়েই তাঁকে হারিয়েছেন তাঁর হবু স্বামী।

অদিত করের আবেগঘন বার্তায় সেই শোকেরই প্রতিফলন দেখা গেছে। কয়েক দিন আগের একটি ছবি, বিয়ের পরিকল্পনা এবং প্রিয় মানুষকে হারানোর আকস্মিক বাস্তবতা—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর লেখা কয়েকটি বাক্য এখন আগামীকে ঘিরে মানুষের শোকের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Tags :

ratul Khaborwala

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।