রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অনির্দিষ্টকাল বিনাবিচারে আটকে রাখা বন্ধের আহ্বান এইচআরডব্লিউর

আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও অন্যদের অনির্দিষ্টকাল ধরে বিনাবিচারে আটকে রাখা বন্ধের জন্য বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটি উল্লেখ করে, ২০২৪ সালের আগস্টে আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থককে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে শত শত ব্যক্তি এখনও কারাগারে বন্দি রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগপত্র বা প্রমাণ দাখিল করা হয়নি।
এইচআরডব্লিউর ভাষ্যমতে, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বিভিন্ন অন্যায় বা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিচার হওয়া প্রয়োজন এবং এতে কোনো কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা থাকলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া যৌক্তিক। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্দোলনের সময় সহিংসতার অভিযোগে অনেকেই সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই আটক হয়ে আছেন। আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, বন্দিদের মধ্যে অনেকেই প্রবীণ ও দীর্ঘদিনের মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। অথচ তাদের জামিন ও জরুরি চিকিৎসার মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।
সংস্থাটি জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাঝে গত কয়েক মাসে কারাগারে অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন মন্তব্য করেন যে, এক সরকারের পর আরেক সরকারের আমলে প্রমাণ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া প্রতিপক্ষের শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে বন্দি রাখা কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। সংস্কারের যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তার প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে খেয়ালখুশিমতো আটকে রাখার এই সংস্কৃতি বন্ধ করা উচিত।
বিবৃতিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এইচআরডব্লিউর মতে, উপযুক্ত আইনি সংস্কার ছাড়া বর্তমান কাঠামোয় বিল পাস হলে মানবাধিকার কমিশন এসব খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তারের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে সক্ষম হবে না।
বিনাবিচারে আটকদের তালিকায় সাবেক সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী দলের প্রতিনিধি, আমলা এবং সমর্থনকারী সাংবাদিকরা রয়েছেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও গুমের মতো অভিযোগের তদন্ত চলছে। সংস্থাটি অভিযোগ করে, বিচারিক আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ জামিনের আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করছে এবং নিম্ন আদালতগুলো ধারাবাহিকভাবে জামিন নামঞ্জুর করছে। উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) কোনো মামলায় জামিন দিলেও মুক্তি পাওয়ার আগেই নতুন মামলায় তাদের পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।
এই চক্রাকার গ্রেপ্তারের উদাহরণ হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের ঘটনা উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ। ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এক হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী কয়েক মাসে আরও কয়েকটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও নিম্ন আদালতে জামিন মেলেনি। হাইকোর্ট জামিন দিলেও নতুন মামলায় পুলিশ ফের তাঁকে আটক দেখায়। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট আপিল বিভাগের চূড়ান্ত হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি পান। পুরো সময়টায় কোনো মামলাতেই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়নি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় আটকদের বিষয়েও আলোকপাত করেছে এইচআরডব্লিউ। সেখানে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের বেশি অভিযোগ ছাড়া কাউকে আটকে রাখার সুযোগ সীমিত হলেও, দেড় শতাধিক বিচারপ্রার্থী ও আসামির কাউকেই জামিন দেওয়া হয়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী (৮১) ও সাবেক সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদারের দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
এইচআরডব্লিউ স্পষ্ট করেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে বিচার শুরুর আগে কাউকে দীর্ঘকাল আটকে রাখা ‘ব্যতিক্রম’ হওয়া উচিত, নিয়ম নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির দ্রুত বিচার পাওয়ার বা জামিনে মুক্তি পাওয়ার পূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে।
Tags :

Shakib

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।