দুই দিনের ব্যবধানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে দুটি কনসার্ট বাতিলের ঘটনায় দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের স্বাধীনতা, শিল্পীদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব—এসব বিষয় নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন শিল্পী, সংগীতশিল্পী ও আয়োজকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার বদলে শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায় বিশেষ করে শিল্পীদের পাশাপাশি যন্ত্রশিল্পী, আয়োজক, মঞ্চকর্মী, শব্দ ও আলোকসজ্জার সঙ্গে যুক্ত কর্মী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। একটি কনসার্ট আয়োজনের সঙ্গে শুধু শিল্পীর পারিশ্রমিকই জড়িত থাকে না; এর সঙ্গে বহু মানুষের শ্রম, সময় ও বিনিয়োগ যুক্ত থাকে। ফলে অনুষ্ঠান বাতিল হলে ক্ষতির পরিধিও বিস্তৃত হয়।
দেশের প্রবীণ সুরকার ও সংগীতজ্ঞ শেখ সাদী খান মনে করেন, সংস্কৃতি কোনো দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। তাঁর মতে, স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের প্রবণতা থাকলেও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সংস্কৃতির গুরুত্বকে সামনে রাখা প্রয়োজন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সংগীতসমৃদ্ধ এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই জেলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন তিনি।
শেখ সাদী খানের বক্তব্য, কোনো অনুষ্ঠানে শব্দের মাত্রা নিয়ে আপত্তি থাকলে শব্দ কমানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাঁর মতে, সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত আলোচনার মাধ্যমে; সরাসরি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কোনো কার্যকর সমাধান নয়। তিনি সরকারের প্রতি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি আরও মনে করেন, রাজনীতি ও সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক। একটি দেশের পরিচয় শুধু তার রাজনৈতিক কাঠামো দিয়ে তৈরি হয় না; ভাষা, গান, সাহিত্য, নাটক, লোকজ ঐতিহ্য ও শিল্পচর্চাও জাতির পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হলে তার প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপরও পড়তে পারে।
প্রবীণ সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনের উদ্বেগের জায়গাটি কিছুটা ভিন্ন। তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন শিল্পী ও আয়োজকদের আর্থিক ক্ষতির দিকে। তাঁর বক্তব্য, কোনো গান বা অনুষ্ঠান কারও পছন্দ না হলে সেটি না দেখার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত অপছন্দ বা মতবিরোধের কারণে একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
সাবিনা ইয়াসমীনের মতে, কোনো সরকারি সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের যদি কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে সেটি অনুষ্ঠানের আগেই আয়োজকদের জানানো উচিত। শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠান বাতিল হলে শিল্পী ও আয়োজকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতি ভবিষ্যতে শিল্পীদের কাজের আগ্রহ ও মানসিক নিশ্চয়তাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
তিনি মনে করেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অবশ্যই শৃঙ্খলাবদ্ধ ও স্বচ্ছভাবে আয়োজন করা দরকার। সেখানে অনিয়ম বা অসঙ্গতি থাকলে কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। কিন্তু গান, কনসার্ট বা সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যাতে আইন মেনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে পারে।
সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ড তারকা হামিন আহমেদও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখছেন। তাঁর মতে, শেষ মুহূর্তে নিবন্ধন বা প্রশাসনিক কোনো কারণ সামনে এনে অনুষ্ঠান বাতিলের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি মনে করেন, গত কয়েক বছরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার বিভিন্ন ঘটনায় যথেষ্ট কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিজেদের আরও শক্তিশালী মনে করতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
হামিন আহমেদ আরও বলেন, অতীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শিল্পীদের হয়রানি ও অপমানের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটার ঝুঁকি থাকে। তাঁর দৃষ্টিতে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক কনসার্ট বাতিলের ঘটনাগুলো তাই কেবল দুটি অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে শিল্পীদের জীবিকা, আয়োজকদের বিনিয়োগ, দর্শকদের বিনোদনের অধিকার এবং দেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশ—সবকিছুর প্রশ্ন।
একটি কনসার্ট ঘিরে স্থানীয় মানুষের আপত্তি থাকতেই পারে। শব্দদূষণ, নিরাপত্তা, যানজট, সময়সীমা কিংবা অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতাও দেখা দিতে পারে। কিন্তু এসব সমস্যার ক্ষেত্রে আগাম সমন্বয়, নির্দিষ্ট নিয়ম এবং প্রশাসনিক নির্দেশনা থাকলে অনেক পরিস্থিতিই এড়ানো সম্ভব। অনুষ্ঠানের অনুমতি, নিরাপত্তা ও শব্দ ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকলে আয়োজকেরাও সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
শিল্পীদের মূল দাবি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে আইন ও নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কোনো আয়োজন বেআইনি হলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, সামাজিক চাপ কিংবা কোনো গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে যেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ না হয়।
সংস্কৃতিকে ঘিরে মতভেদ থাকলেও আলোচনার পথ খোলা রাখার ওপরই জোর দিচ্ছেন শিল্পীরা। তাঁদের মতে, গান, নাটক, সাহিত্য ও অন্যান্য শিল্পচর্চা সমাজে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ তৈরি করে। সেই পরিসর যত বেশি উন্মুক্ত থাকবে, সমাজে সহনশীলতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার সুযোগও তত বাড়বে।
সরকারের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা মূলত তিনটি—সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা, শিল্পী ও আয়োজকদের নিরাপত্তা এবং কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি দেখা দিলে আগেই সমাধানের উদ্যোগ। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পক্ষ থেকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেখানে আইন মেনে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হতে পারে।
শিল্পীদের বক্তব্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো—সংস্কৃতি নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেওয়া যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত না হয়। তাঁদের মতে, দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে প্রশাসন, শিল্পী, আয়োজক ও সাধারণ মানুষ—সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। গান ও সংস্কৃতির চর্চা বন্ধ নয়, বরং নিয়ম, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে তা আরও বিস্তৃত করার পথই খুঁজতে হবে।



