জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার রায়কালী ইউনিয়নে অন্যের বাড়ি দখলের অভিযোগে মিজানুর রহমান বাবুকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে উপজেলা বিএনপি। তিনি রায়কালী ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার বিরুদ্ধে বাড়ি দখল এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর এ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গতকাল রোববার রাতে মিজানুর রহমান বাবুর বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি কামরুজ্জামান কমল, সাধারণ সম্পাদক আরিফ ইফতেখার আহম্মেদ রানা, সাংগঠনিক সম্পাদক সামিউল হাসান ইমন ও ইউএম মোশারফ হোসেন স্বাক্ষরিত একটি বহিষ্কারাদেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বহিষ্কারাদেশে বলা হয়েছে, রায়কালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেনের বাড়ি দখলসহ মিজানুর রহমান বাবুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ জুলাই তাকে বাড়িটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি বাড়ি ছেড়ে না দেওয়ায় এবং দলের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিএনপির সব পর্যায়ের সদস্যপদ এবং ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ থেকেও তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রায়কালী গ্রামের প্রায় চার শতক জমির ওপর বেলাল হোসেনের একটি দোতলা পাকা বাড়ি রয়েছে। কয়েক বছর আগে বাড়িটি অগ্রণী ব্যাংকের জিয়ানগর শাখায় বন্ধক রেখে তিনি ১২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যে বেলাল হোসেন বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। পরে তার স্ত্রী শাহনাজ বেগমও বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। এরপরই মিজানুর রহমান বাবু বাড়িটি দখলে নেন বলে অভিযোগ ওঠে।
বাড়ি দখলের অভিযোগে বেলাল হোসেনের স্ত্রী শাহনাজ বেগম আক্কেলপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেয় এবং মিজানুর রহমান বাবুর সঙ্গে কথা বলে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তবে বাড়ি দখলের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন মিজানুর রহমান বাবু। তার দাবি, যে জমির ওপর বাড়িটি নির্মিত, সেটি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেলাল হোসেন তাদের জমি দখল করে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। এখন তারা নিজেদের জমি নিজেদের দখলে নিয়েছেন। ফলে ঘটনাটিকে অন্যের বাড়ি দখল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফ ইফতেখার আহম্মেদ রানা মিজানুর রহমান বাবুর বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অনিয়ম বা অপকর্মে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। রায়কালী ইউনিয়নে এমন অভিযোগের পর দলীয়ভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন রেজা জানান, বাড়ি দখলসংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ থানায় এসেছে। অভিযোগটি তদন্তের জন্য উপপরিদর্শক বজলুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে জমি ও বাড়ির মালিকানা এবং দখলসংক্রান্ত প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা হবে।
তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া উপপরিদর্শক বজলুর রহমান জানান, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে মিজানুর রহমান বাবুর সঙ্গে কথা বলেছেন। সেখানে বাবু বাড়ির জায়গাটি তার দাদার সম্পত্তি বলে দাবি করেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে থানায় বসে আলোচনা করার কথা থাকলেও তিনি নির্ধারিত সময়ে সেখানে উপস্থিত হননি।
ঘটনাটিকে ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন জমিটির প্রকৃত মালিকানা ও বাড়িটির দখল নিয়ে। এক পক্ষ জমিটিকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করছে, অন্য পক্ষ বাড়ি দখলের অভিযোগ করেছে। তাই শুধু দলীয় সিদ্ধান্তের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকছে না; জমির মালিকানা, দখল এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুলিশি তদন্তে এসব তথ্য যাচাইয়ের পর ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
এদিকে, একজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগ এবং পরবর্তী বহিষ্কারের ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের আচরণ ও জবাবদিহির বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার না করার যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, বহিষ্কারাদেশের ঘটনাটি তারই একটি কঠোর দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।


