ঢাকার সাভারের চাকুলিয়া এলাকায় সুফি সাধক কাজী জাবের আল জাহাঙ্গীরের বাড়িতে আগামী ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট আয়োজিত ওরস শরিফ বন্ধের দাবিতে উপজেলা প্রশাসন ও থানায় স্মারকলিপি দিয়েছেন স্থানীয় একদল ধর্মভিত্তিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী। নিজেদের ‘তৌহিদি জনতা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া এই পক্ষের অভিযোগ, ওরসকে ঘিরে ইসলাম ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রচার করা হয়। একই সঙ্গে তারা এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন।
রোববার (২৩ আগস্ট) সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সাভার মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এতে ১০ জন ব্যক্তি স্বাক্ষর করেন। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে হেফাজতে ইসলামের তিনজন নেতা, বিএনপির দুজন নেতা, যুবদলের একজন নেতা, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের একজন নেতা, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একজন নেতা, জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মী এবং স্থানীয় একজন ধর্মীয় নেতা রয়েছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কাজী জাবের আল জাহাঙ্গীরের বিভিন্ন বক্তব্যে আল্লাহ, রাসুল ও পীরের মধ্যে পার্থক্য নেই—এমন ধারণা প্রকাশ পেয়েছে। নামাজ, রোজা, জান্নাত-জাহান্নাম ও কেয়ামত নিয়েও তিনি বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে ধর্মীয় বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
স্মারকলিপিতে ওরস বন্ধের পাশাপাশি তৌহিদি জনতার বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা চাওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগগুলো সরাসরি অস্বীকার করেছেন কাজী জাবের আল জাহাঙ্গীর। তার দাবি, ধর্মীয় বিষয়ে তাকে ঘিরে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা সত্য নয়। তিনি বলেন, কারও সঙ্গে ধর্মীয় বিতর্কে জড়ানোর ইচ্ছা তার নেই। তবে অভিযোগকারীরা চাইলে প্রশাসনের উপস্থিতিতে কোরআন-হাদিসের দলিল নিয়ে আলোচনায় বসতে তিনি প্রস্তুত।
জাবের আল জাহাঙ্গীরের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বাবার ওফাত উপলক্ষে প্রায় ১৯ বছর ধরে তাদের বাড়িতে ঘরোয়াভাবে ওরস হয়ে আসছে। এবারও বাড়ির সীমানার ভেতরেই অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, এবার বাইরে কোনো প্যান্ডেল স্থাপন বা মাইক ব্যবহারের পরিকল্পনা নেই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তার বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় পরিবারের সদস্যসহ কয়েকজন আহত হন এবং বাড়িঘর ও যানবাহনে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে তার দাবি। ওই ঘটনার পর মামলা-পাল্টা মামলা হয়েছে। এবার ওরসকে কেন্দ্র করে আবারও হামলার আশঙ্কা করছেন তিনি। এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলেও জানান।
ওরস বন্ধের দাবির পক্ষে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হাক্কানী বলেন, জাবের আল জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই। তাদের আপত্তি তার কথিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও বক্তব্য নিয়ে। তার দাবি, এসব বক্তব্য কোরআন-হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তর শাখার মহাসচিব মাওলানা আলী আজমের বক্তব্য, স্থানীয় মুসল্লি ও আলেম-ওলামারা আগে থেকেই বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আসছেন। তাদের কাছ থেকে ওরসকে কেন্দ্র করে ধর্মীয়ভাবে আপত্তিকর বক্তব্যের অভিযোগ পাওয়ার পর তারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সাভার থানা কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী আশরাফ তৈয়ব বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য ওরস বন্ধ করা নয়; বরং জাবের আল জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে যে অনৈসলামিক কার্যকলাপের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো বন্ধ করা।
সাভার থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাইদুল ইবনে হাসিব সোহেলও সংঘাত এড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার ভাষ্য, এক পক্ষ ওরস আয়োজন করতে চায়, অন্য পক্ষ তা বন্ধের দাবি জানাচ্ছে। ফলে এলাকায় মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি কোনো ধরনের মারামারি, হানাহানি বা বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য চান না বলে জানান।
সাভার থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মঞ্জু মোল্লার বক্তব্যও প্রায় একই ধরনের। তিনি বলেন, ওরস আয়োজন তাদের মূল আপত্তির বিষয় নয়; বরং সেখানে ধর্মীয়ভাবে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া হলে তা বন্ধ হওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।
প্রশাসনের অবস্থান
পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনও সতর্ক রয়েছে। সাভারের ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম জানান, যারা অভিযোগ নিয়ে এসেছেন, তাদের শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল আলম বলেন, অভিযোগটি নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়েছে। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে ২৫ থেকে ২৭ আগস্টের অনুষ্ঠানকে ঘিরে উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে আয়োজকদের দাবি, অনুষ্ঠানটি দীর্ঘদিনের পারিবারিক ধর্মীয় আয়োজন এবং সীমিত পরিসরে বাড়ির ভেতরেই হবে। অন্যদিকে বিরোধিতাকারীরা ধর্মীয় বক্তব্য নিয়ে আপত্তি তুলে প্রশাসনিকভাবে অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সাভারের চাকুলিয়া এলাকায় শাহ সুফি সৈয়দ মাওলানা কাজী আফসার উদ্দিন আল জাহাঙ্গীর আল সুরেশ্বরীর মাজার এবং তার ছেলে কাজী জাবের আহমেদের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনার পর এলাকায় মামলা-পাল্টা মামলা ও বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে—ধর্মীয় মতবিরোধকে কেন্দ্র করে যাতে নতুন করে কোনো সংঘাত, হামলা কিংবা আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, তা নিশ্চিত করা।
আয়োজন ও বিরোধিতা—দুই পক্ষের অবস্থানই এখন প্রশাসনের নজরে। ফলে নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠানটি কীভাবে হবে এবং স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


