যশোরের আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী আল-আমিন হোসেন (২৯) চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড মামলার রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ভয়াবহ এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে গোলাম রসুল (৩০) নামের অন্যতম প্রধান আসামিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি এ হত্যাকাণ্ডে নিজের জড়িত থাকার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বলে পিবিআই সূত্রে জানা গেছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার (২৬ আগস্ট) ভোরের দিকে গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী থানার পুইশুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পুইশুর গ্রামে এক যৌথ অভিযান চালানো হয়। সেখানকার স্থানীয় বাসু সিকদারের বসতঘরে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় অভিযুক্ত গোলাম রসুলকে ঘিরে ফেলে গ্রেপ্তার করে পিবিআই যশোর ডিস্ট্রিক্টের একটি দল।
মামলার বিবরণ ও পিবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্ত সূত্র জানায়, গত ২০ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে যশোর শহরের বিখ্যাত স্বর্ণপট্টিতে অবস্থিত নিজ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন শহরের পূর্ব বারান্দীপাড়া মাঠপাড়ার বাসিন্দা ও জুয়েলারি ব্যবসায়ী আল-আমিন হোসেন। কিন্তু তিনি আর বাড়ি ফিরতে পারেননি। সেদিনই যশোর শহরের পূর্ব বারান্দীপাড়া লিচুতলা মাদরাসার পেছনে থাকা বাবুর মেহগনি বাগান থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত ও রক্তসংক্রান্ত মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর নিহতের মা বাদী হয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাত পরিচয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তী সময়ে মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তের দায়িত্বভার গ্রহণ করে পিবিআই।
ঘটনার পর থেকে তথ্যপ্রযুক্তি ও সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা নজরদারির ওপর নির্ভর করে পিবিআই অনুসন্ধান চালাতে থাকে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, নিহত স্বর্ণ ব্যবসায়ী আল-আমিনের সাথে আসামি গোলাম রসুলসহ কয়েকজনের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক লেনদেন ও ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তীব্র বিরোধ চলে আসছিল। এই পুরোনো শত্রুতার জের ধরেই আল-আমিনকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা আঁকা হয়।
পিবিআইয়ের দেওয়া তথ্য মতে, হত্যাকাণ্ডের দিন দুপুরের দিকে আসামিরা কৌশলে মোবাইল ফোনে বারবার আল-আমিনকে কল করে ফাঁদে ফেলে লিচুতলা মাদরাসার পেছনের নির্জন মেহগনি বাগানে ডেকে আনে। সেখানে পৌঁছামাত্রই গোলাম রসুল ও তাঁর সহযোগীরা ধারালো চাকু দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে এবং ভারী ইট দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি আঘাত করে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ব্যবসায়ী আল-আমিন। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে গোলাম রসুল নিজের মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দ্রুত আত্মগোপনে চলে যান।
পরবর্তীতে পিবিআই দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকার সব সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। আধুনিক প্রযুক্তি ও কল ডেট রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আসামি গোলাম রসুলের সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করে গোপালগঞ্জে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আইনগত আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ জানান, গ্রেপ্তারকৃত গোলাম রসুল অপরাধ স্বীকার করে ঘটনার পেছনের মূল কারণ ও সহযোগীদের নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তাঁকে আরও নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হচ্ছে।
পিবিআই যশোর জেলা পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, মূলত ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে জের ধরেই আল-আমিনকে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার গোলাম রসুলকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনার সাথে যুক্ত অপরাপর সহযোগীদের দ্রুততম সময়ে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান জোরদার রাখা হয়েছে।



