তাজউদ্দীনের ছবি সরানোয় সোহেল তাজের ক্ষোভ

মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

হবিগঞ্জের মাধবপুরে মুক্তিযোদ্ধা চত্বর থেকে জাতীয় চার নেতার ছবি সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। তিনি জাতীয় চার নেতার অন্যতম তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত একটি সংবাদ শেয়ার করে তিনি বর্তমান সরকারের কাছে জানতে চেয়েছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকার সমর্থন করে কি না এবং সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সম্মান ও লালন করে কি না।

ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার জগদীশপুর এলাকায়, তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধের পাশে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, সরকারি অনুদানে নির্মিত এই চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ম্যুরালাকৃতির ছবি স্থাপন করা ছিল। সম্প্রতি সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক মাস আগে মাধবপুরের তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ বিন কাসেমের নির্দেশে ছবিগুলো সরানো হয়। তাঁদের দাবি, ছবিগুলোকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ উল্লেখ করে সেগুলো অপসারণ করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ক্ষোভ আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।

শুক্রবার মধ্যরাতে সোহেল তাজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ শেয়ার করেন। সেখানে তিনি বিএনপি সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় উঠে এসেছে—জাতীয় চার নেতার স্মৃতির প্রতি রাষ্ট্রের অবস্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা।

সোহেল তাজ তাঁর পোস্টে বলেন, ‘বিএনপি সরকারকে স্পষ্ট করে বলতে হবে তারা এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে কিনা। তাদের স্পষ্ট করে বলতে হবে তারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সম্মান এবং লালন করে কিনা।’

তাঁর এই বক্তব্যের পর মাধবপুরে জাতীয় চার নেতার ছবি অপসারণের বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে তাজউদ্দীন আহমদের ছবি সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি সোহেল তাজের জন্য ব্যক্তিগতভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে জাতীয় চার নেতার মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁদের অবদানকে সামনে রেখে স্থানীয় পর্যায়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, ছিল না কোনো আলোচনা

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শহীদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে জাতীয় চার নেতার ছবি ছিল। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত একটি স্থাপনা থেকে কোনো যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ছবিগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের নেতারাও এই অপসারণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, জাতীয় চার নেতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের স্মৃতি ও অবদান স্মরণে স্থাপিত ছবি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণ জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

মাধবপুর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. অলিদ মিয়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তাঁদের স্মৃতি ও অবদান যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা উচিত।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশ্ন, একটি মুক্তিযোদ্ধা চত্বরের মতো স্থানে জাতীয় চার নেতার ছবি কীভাবে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হিসেবে বিবেচিত হলো। তাঁদের আরও প্রশ্ন, ছবি সরানোর সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন, কোন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছে এবং এর পেছনে কী কারণ ছিল।

তাঁদের অভিযোগ, ছবি অপসারণের আগে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। এ কারণে তাঁরা শুধু অপসারণের কারণ স্পষ্ট করার দাবি জানাননি, ছবিগুলো আগের জায়গায় পুনঃস্থাপনের দাবিও জানিয়েছেন।

প্রশাসনের বক্তব্য নিয়ে অপেক্ষা

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিবাদ হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনও স্পষ্ট হয়নি বলে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে মাধবপুরের বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

ফলে ছবিগুলো সরানোর সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট কারণ, তৎকালীন প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হিসেবে ছবিগুলোকে বিবেচনার ভিত্তি—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

একদিকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ছবিগুলো পুনঃস্থাপনের দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে সোহেল তাজের বক্তব্যে ঘটনাটি জাতীয় ও রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। জাতীয় চার নেতার স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং সরকারি স্থাপনায় তাঁদের প্রতিকৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি ঘিরে এখন প্রশাসনিক ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঘটনার পর সামনে আসা মূল প্রশ্নগুলো হলো—কেন ছবিগুলো সরানো হয়েছিল, কে বা কারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং শেষ পর্যন্ত অপসারিত ছবিগুলো পুনঃস্থাপন করা হবে কি না। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের স্পষ্ট বক্তব্যই এখন প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।