দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিস্তারের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। দ্বিতীয় দফায় ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে আবেদন করা ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটিকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের আগামী পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে। তবে কোন আটটি প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছে, তা এখনো প্রকাশ করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ডিজিটাল ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় ভিন্ন কাঠামোয় পরিচালিত হবে। এসব ব্যাংকের নিজস্ব শাখা, উপশাখা কিংবা এটিএম বুথ থাকবে না। গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের প্রায় পুরো যোগাযোগই হবে ডিজিটাল মাধ্যমে। মোবাইল ফোন, অ্যাপ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে হিসাব খোলা, টাকা জমা, অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, ঋণের আবেদনসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
প্রযুক্তিনির্ভর সেবার অংশ হিসেবে ভার্চুয়াল কার্ড, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন এবং অন্যান্য ডিজিটাল সুবিধাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ব্যাংকের সেবা নিতে গ্রাহককে নির্দিষ্ট শাখায় গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার প্রয়োজন কমে আসতে পারে।
দ্বিতীয় দফায় লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে রবি আজিয়াটার ‘বুস্ট’, বাংলালিংক ও স্কয়ারের যৌথ উদ্যোগ ‘নোভা ডিজিটাল ব্যাংক’, আকিজ রিসোর্সের ‘মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক’, আশার ‘মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক’, ‘আমার ডিজিটাল ব্যাংক-২২’, ‘৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক’, ‘ব্রিটিশ-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক’, ভুটানের ডিকে ব্যাংকের ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান’, অ্যাপ ব্যাংক, জাপান বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক এবং বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক। এসব আবেদনকারীর মধ্য থেকেই আটটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংক চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার ব্যয় ও সময় কমানো। প্রচলিত ব্যাংকের শাখা স্থাপন ও পরিচালনায় ভবন, জনবল, নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোর জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে শাখাভিত্তিক কাঠামোর ওপর নির্ভরতা না থাকায় পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেই সুবিধা গ্রাহকের জন্য তুলনামূলক সহজ ও দ্রুত সেবায় রূপ নিতে পারে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ, তরুণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য এ ধরনের ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যাদের কাছাকাছি ব্যাংকের শাখা নেই কিংবা নিয়মিত ব্যাংকে যাওয়ার সময় বা সুযোগ কম, তারা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবা নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের হিসাব খোলা, অর্থ গ্রহণ ও পাঠানো এবং ঋণের আবেদন প্রক্রিয়াও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলীর মতে, ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে কম খরচে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। নতুন ধরনের ব্যাংকের প্রবেশে প্রতিযোগিতা বাড়লে প্রচলিত ব্যাংকগুলোও প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়াতে এবং নিজেদের ব্যবসায়িক কাঠামো আধুনিক করতে উৎসাহিত হতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকের সাফল্যের জন্য শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা এবং কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা অপরিহার্য। গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সুরক্ষিত রাখা, অনলাইন জালিয়াতি ঠেকানো এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সেবা ব্যাহত হলে দ্রুত তা পুনরুদ্ধার করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্পর্কে গ্রাহকের সচেতনতার ঘাটতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফায় জমা পড়া আবেদনগুলোর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী পর্ষদ সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে এবং সেখানেই চূড়ান্ত লাইসেন্স অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগোবে।
লাইসেন্স অনুমোদন পেলে দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং সেবার ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নতুন এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে প্রযুক্তির মান, গ্রাহক সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং মানুষের ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবহারের সক্ষমতার ওপর।



