বিশ্বকাপ ফুটবলের কিছু অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা ঘিরে সমালোচনার মুখে থাকা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছেন ফরাসি ফুটবল কিংবদন্তি ও উয়েফার সাবেক সভাপতি মিশেল প্লাতিনি। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের বিতর্কের চেয়েও বড় বিষয় হলো ফুটবলের প্রচলিত নিয়ম ও নীতিমালার প্রতি ফিফা সভাপতির অবস্থান।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম কানালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্লাতিনি বলেন, ফুটবলের নিয়মের রক্ষক হিসেবে ইনফান্তিনোর দায়িত্ব ছিল সেগুলো যথাযথভাবে মেনে চলা। তাঁর অভিযোগ, সেই দায়িত্ব পালনে ইনফান্তিনো ব্যর্থ হয়েছেন।
প্লাতিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক বিষয় এক জিনিস, কিন্তু ইনফান্তিনো ব্যর্থ হয়েছেন কারণ তিনি ফুটবলের নিয়মের একজন রক্ষক এবং সেগুলোকে সম্মান করেননি।’
বিশ্বকাপের বিভিন্ন আয়োজন ও ম্যাচ পরিচালনার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্লাতিনি। বিশেষ করে ম্যাচ চলাকালে পানিবিরতি, বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে বিরতি এবং ফাইনালে অতিরিক্ত দীর্ঘ বিরতির সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে ফুটবলের প্রচলিত কাঠামো ও নিয়মকে পরিবর্তন করা উচিত নয়।
ফাইনাল ম্যাচে ৩০ মিনিটের বিরতির বিষয়টিও তাঁর সমালোচনার মুখে পড়ে। প্লাতিনি বলেন, বিজ্ঞাপনের জন্য বিরতি ফুটবলের কোনো নিয়ম নয় এবং ফাইনালে ৩০ মিনিটের বিরতিও প্রচলিত নিয়মের অংশ নয়। একটি লাল কার্ডের ঘটনাকেও তিনি অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখেছেন।
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে সরাসরি অবস্থান জানিয়ে প্লাতিনি বলেন, যিনি ফুটবলের নিয়ম রক্ষার দায়িত্বে আছেন অথচ সেই নিয়মকে গুরুত্ব দেন না, তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।
ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে অর্থ ও ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণের অভিযোগও তুলেছেন প্লাতিনি। তাঁর ভাষ্য, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সরাসরি তাঁকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। প্লাতিনি আরও বলেন, ইনফান্তিনো অর্থ ও ক্ষমতা পছন্দ করেন—এমন ধারণা তাঁর অনেক আগে থেকেই ছিল।
বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে প্লাতিনির নিজের অবস্থানও বিতর্কমুক্ত ছিল না। ২০১৫ সালে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়েছিলেন তিনি। সে সময় তিনি উয়েফার সভাপতি ছিলেন এবং ফিফার তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্লাটারের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়েও ছিলেন।
ব্লাটারের কাছ থেকে প্লাতিনি প্রায় ২০ লাখ ডলার পেয়েছিলেন—এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে ফিফার নৈতিকতা ও শৃঙ্খলাবিষয়ক প্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগের পর প্লাতিনি উয়েফার সভাপতির পদ ছাড়েন এবং ফিফার সভাপতি হওয়ার সম্ভাবনাও কার্যত শেষ হয়ে যায়। পরে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
ফলে বর্তমান ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে প্লাতিনির এই প্রকাশ্য অবস্থান বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসন নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে ফুটবলের ঐতিহ্যগত নিয়ম ও পরিচালন কাঠামো কতটা অক্ষুণ্ন থাকছে, তা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।
প্লাতিনির বক্তব্য মূলত ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ধরন এবং ফুটবল পরিচালনায় বাণিজ্যিক প্রভাবের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। তবে তাঁর অভিযোগ ও মূল্যায়ন তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হবে।



