আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে লিওনেল মেসির বিদায়ের ঘোষণায় আবেগাপ্লুত হয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম। আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তির অবসরকে একটি যুগের সমাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করে তার দীর্ঘ ফুটবল-যাত্রার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটার।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আর্জেন্টিনার জার্সি পরা নিজের একটি ছবি প্রকাশ করেন মুশফিকুর রহিম। ছবির সঙ্গে মেসিকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেন, ‘আপনার অবসরের জন্য শুভকামনা। ফুটবল জগতের এত স্মৃতি উপহার দেওয়ার জন্য এবং কয়েক দশক ধরে আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। একটি যুগের অবসান।’
মুশফিকের এই বার্তায় ফুটবলের প্রতি তার ব্যক্তিগত আবেগেরও প্রকাশ ঘটেছে। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও মেসির বিপুল জনপ্রিয়তার কথা বিবেচনায় নিলে এমন প্রতিক্রিয়া খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়। বিশেষ করে বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে আর্জেন্টিনার পতাকা, জার্সি ও মেসিকে ঘিরে যে উন্মাদনা দেখা যায়, তার অন্যতম বড় কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন এই ফুটবল তারকা।
এর আগে একই দিনে মেসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দেন। ৩৯ বছর বয়সী এই আর্জেন্টাইন তারকা দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। তার ক্যারিয়ারে এসেছে সাফল্য, হতাশা, সমালোচনা এবং শেষ পর্যন্ত বহুল কাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক শিরোপার পূর্ণতা।
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে মেসির অভিষেক হয় ২০০৫ সালে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দলের প্রধান ভরসা এবং ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী খেলোয়াড়। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুললেও সেবার শিরোপা জিততে পারেননি। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালেও হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় তার।
তবে সেই ব্যর্থতার অধ্যায় পেরিয়ে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নতুন মোড় নেয় ২০২১ সালে। সেবার কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের স্বাদ পান তিনি। পরের বছর ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়নদের লড়াই ফিনালিসিমায় ইতালিকে হারিয়েও সাফল্য পায় আর্জেন্টিনা।
এরপর আসে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। পুরো আসরে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে মেসি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নিয়ে যান। ফ্রান্সের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ফাইনালে নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে ম্যাচ ৩-৩ সমতায় শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলেন মেসি। ব্যক্তিগতভাবেও এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অর্জনগুলোর একটি।
জাতীয় দলের হয়ে ২০২৪ সালেও সাফল্য পান মেসি। কোপা আমেরিকার ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার মহাদেশীয় শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। ফলে বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা—আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির অর্জনের তালিকা আরও সমৃদ্ধ হয়।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির পরিসংখ্যানও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের সাক্ষ্য দেয়। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করে তিনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের শীর্ষে অবস্থান করছেন। শুধু গোল করাই নয়, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি, আক্রমণ পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল অসাধারণ।
মেসির বিদায়ের ঘোষণা তাই শুধু আর্জেন্টিনার জন্য নয়, বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের জন্যও একটি আবেগঘন মুহূর্ত। দীর্ঘ সময় ধরে যারা তার খেলা দেখে বড় হয়েছেন, তাদের কাছে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি একটি প্রজন্মের স্মৃতির সমাপ্তির মতো। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেও তার প্রভাব যে কতটা বিস্তৃত, মুশফিকুর রহিমের আবেগঘন বার্তাই তার একটি প্রতীকী উদাহরণ।
মেসির জার্সিতে তার শেষ অধ্যায় কীভাবে সম্পন্ন হবে, সেটিই এখন ভক্তদের আলোচনার বিষয়। তবে মাঠে তার অর্জন, সৃষ্ট অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত এবং ফুটবলকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তাকে ইতোমধ্যে ইতিহাসের স্থায়ী অংশ করে দিয়েছে।



