বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ
আজ ৫ সেপ্টেম্বর—বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের শাহাদাতবার্ষিকী।
১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার রক্তাক্ত রণাঙ্গনে এক অবিশ্বাস্য বীরত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শহীদ হন বাঙালির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান। যশোরের গোয়ালহাটি ও ছুটিপুরের মাটিতে সেদিন শুধু একজন সৈনিকের মৃত্যু ঘটেনি—জন্ম নিয়েছিল এমন এক অমর কিংবদন্তির, যার বীরত্ব ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরকাল দীপ্ত হয়ে থাকবে।
নূর মোহাম্মদ শেখের জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন যশোর জেলার নড়াইল মহকুমার মহিষখোলা গ্রামে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ আমানত শেখ ছিলেন কৃষক এবং মা জেন্নাতুন্নেছা ছিলেন গৃহিণী। শৈশবেই বাবা-মাকে হারান তিনি। সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যেও জীবন তাঁকে শিখিয়েছিল সংগ্রাম, দায়িত্ববোধ ও সাহসের পাঠ।
সংসারের টানাপোড়েন তাঁকে কৈশোরেই বাস্তব জীবনের কঠিনতার মুখোমুখি করে। ১৯৫২ সালে অল্প বয়সে তাঁর বিয়ে হয় তোতা বিবির সঙ্গে। জীবিকার সন্ধানে তিনি প্রথমে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এ সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর ইপিআর নম্বর ছিল ৯৪৫৯। পরে তিনি ল্যান্স নায়েক পদে উন্নীত হন।
সৈনিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন সাহসী ও কর্তব্যপরায়ণ। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে দিনাজপুর সেক্টরে দায়িত্ব পালনকালে আহত হন। তাঁর সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘তকমা-ই-জং’ ও ‘সিতারা-ই-হারব’ পদক লাভ করেন।
১৯৭০ সালের ১০ জুলাই তাঁকে দিনাজপুর থেকে যশোর সেক্টরে বদলি করা হয়। ১৯৭১ সালে যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮ নম্বর সেক্টরে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ তখন স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নিমগ্ন। একজন সৈনিক হিসেবে নূর মোহাম্মদের কাছে তখন কর্তব্যের অর্থ ছিল একটাই—দেশকে শত্রুমুক্ত করা।
৫ সেপ্টেম্বরের সেই অমর সকাল
১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সকাল। নূর মোহাম্মদ শেখের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল গোয়ালহাটি গ্রামের কাছে ছুটিপুর প্রতিরক্ষা এলাকার সামনে টহল দিচ্ছিল। তাঁদের দায়িত্ব ছিল শত্রুর গতিবিধির ওপর নজর রাখা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য নিজ প্রতিরক্ষা অবস্থানে পৌঁছে দেওয়া। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু করে।
পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
শত্রুর গুলিতে তাঁর সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া গুরুতর আহত হন। তখন নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে নূর মোহাম্মদ আহত সহযোদ্ধাকে কাঁধে তুলে নেন। হাতে তাঁর এলএমজি। একদিকে আহত সহযোদ্ধাকে বাঁচানোর চেষ্টা, অন্যদিকে শত্রুর বিরুদ্ধে অবিরাম গুলি—তিনি একই সঙ্গে দুটি দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সবাই একসঙ্গে পিছু হটলে শত্রুর গুলিতে পুরো দলই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।
তাই তিনি সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং নিজে কাভারিং ফায়ারের দায়িত্ব নেন। সহযোদ্ধা মোস্তফা কামাল তাঁকে ফেলে যেতে রাজি না হলেও নূর মোহাম্মদ তাঁকে জোর করে পেছনে পাঠান। এরপর আহত অবস্থায় একাই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান।
একসময় মর্টার শেলের আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন। শরীর ক্ষত-বিক্ষত, চারদিকে শত্রুর গুলিবর্ষণ—তবুও তাঁর হাতের অস্ত্র থামেনি। নিজের জীবন বাঁচানোর শেষ সুযোগটুকুও তিনি নেননি। কারণ তাঁর কাছে তখন নিজের জীবন অপেক্ষা সহযোদ্ধাদের জীবন এবং মাতৃভূমির নিরাপত্তাই ছিল বড়।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করতে করতেই তিনি শহীদ হন।
সেদিন গোয়ালহাটির মাটিতে ঝরে পড়েছিল একজন মানুষের রক্ত; কিন্তু সেই রক্তে লেখা হয়েছিল বাঙালির বীরত্বের এক অমর মহাকাব্য।
যে মৃত্যু অমরত্বের
বীরত্ব ও আত্মত্যাগের অসামান্য স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’-এ ভূষিত করে।
তাঁর মরদেহ যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুরে সমাহিত করা হয়। আজও সেই সমাধি জাতির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে।
শুধু সমাধি নয়, তাঁর জন্মভূমিও বহন করছে তাঁর অমর স্মৃতি। ২০০৮ সালের ১৮ মার্চ তাঁর জন্মগ্রাম মহিষখোলার নাম পরিবর্তন করে ‘নূর মোহাম্মদ নগর’ রাখা হয়। তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্মারক স্থাপনা।
নূর মোহাম্মদ শেখের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বীরত্ব শুধু অস্ত্র হাতে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নাম নয়; বীরত্ব হলো বিপদের মুখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে অন্যের জীবন রক্ষা করা।
তিনি হয়তো জন্মেছিলেন নড়াইলের এক সাধারণ গ্রামে, বেড়ে উঠেছিলেন সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে। কিন্তু দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগ তাঁকে অসাধারণ করে তুলেছিল। তাঁর হাতে ছিল একটি অস্ত্র, কিন্তু হৃদয়ে ছিল একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
নূর মোহাম্মদ শেখ তাই শুধু একজন বীরশ্রেষ্ঠের নাম নয়—তিনি আত্মত্যাগের প্রতীক, কর্তব্যনিষ্ঠার প্রতীক, সহযোদ্ধার প্রতি ভালোবাসার প্রতীক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবের এক উজ্জ্বল নাম।
আজ তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই অকুতোভয় সৈনিককে, যিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে সহযোদ্ধাদের বাঁচার পথ করে দিয়েছিলেন।
যে বীরের রক্তে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস,
তাঁকে কোনোদিন ভোলা যায় না।
ভোলা যাবে না।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ—
আপনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
আপনার আত্মত্যাগের ঋণ বাংলাদেশ কোনোদিন শোধ করতে পারবে না।
আপনি বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের মাটিতে,
বাংলাদেশের পতাকায়,
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে—
চিরকাল।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।


