সরকার পতনে বিদেশি সহায়তার প্রস্তাব পেয়েছিল পিএএস: হাদি

মালয়েশিয়ার প্রভাবশালী ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল পার্টি ইসলাম সেমালয়েশিয়া (পিএএস) একসময় একটি বিদেশি শক্তির কাছ থেকে দেশটির তৎকালীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সহায়তার প্রস্তাব পেয়েছিল বলে দাবি করেছেন দলটির সভাপতি আব্দুল হাদি আওয়াং। তবে পিএএস ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং দেশের রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে বলে জানিয়েছেন তিনি।

মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম ফ্রি মালয়েশিয়া টুডের (এফএমটি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার কেলান্তান রাজ্যের কোতা বারু জেলার পেংকালা চেপায় অবস্থিত পুসাত তারবিয়াহ ইসলামিয়াহ কেলান্তান (পুতীক) কেন্দ্রে পিএএসের ৭২তম বার্ষিক সাধারণ সম্মেলনের সমাপনী ভাষণে হাদি এসব কথা বলেন।

হাদির ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মালয়েশিয়া সফরের সময়। সে সময় পিএএস বিরোধী জোট পাকাতান রাকইয়াতের অংশ ছিল। ওই প্রেক্ষাপটে দলের কয়েকজন নেতাকে কুয়ালালামপুরে মার্কিন দূতাবাসে বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।

হাদি জানান, পিএএসের তৎকালীন সহকারী মহাসচিব তাকিউদ্দীন হাসান এবং তার রাজনৈতিক সচিব আহমদ সামসুরি মোখতার ওই বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে মালয়েশিয়ার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে আলোচনা হয় এবং এ কাজে সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

হাদি বলেন, দলের ওই দুই নেতা প্রস্তাবটিতে প্রভাবিত হননি। বরং তারা তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তার ভাষায়, পিএএস কোনো বিদেশি শক্তির সহায়তায় দেশের সরকার পরিবর্তনের পথ বেছে নিতে চায়নি।

এরপর মার্কিন রাষ্ট্রদূত হাদির সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেন বলে জানান তিনি। ওই বৈঠকে হাদির সঙ্গে পিএএসের তৎকালীন মহাসচিব মুস্তফা আলিও ছিলেন।

হাদির দাবি, বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাকে প্রশ্ন করেন—পিএএস মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে দেখতে চায়। জবাবে তিনি উল্টো জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্র কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়। হাদি জানান, তার এই পাল্টা প্রশ্নে রাষ্ট্রদূত বিস্মিত হয়েছিলেন।

পরে তিনি বিষয়টি মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদকে জানান। হাদির বক্তব্য অনুযায়ী, মাহাথির তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ওই উত্তরটি ভালো হয়েছে।

ঘটনার চার বছর পর, ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন জোট বারিসান নাসিওনাল (বিএন) পরাজিত হয়। ওই নির্বাচনের আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ানএমডিবি-সংক্রান্ত কেলেঙ্কারি বিরোধীদের প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।

নির্বাচনে মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন পাকাতান হারাপান (পিএইচ) জোট জয়ী হলে বিএন-এর দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটে। মাহাথির আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনটি মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে দেশটির কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় থাকা বিএন প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতা হারায়।

তবে হাদির বক্তব্যের বিষয়ে মার্কিন পক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ২০১৪ সালের ওই বৈঠকে সরকার পতনের জন্য বিদেশি সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল—হাদির এই দাবিটি তার বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

এদিকে পিএএসের তৎকালীন নেতা তাকিউদ্দীন হাসানও মার্কিন দূতাবাসে বৈঠকে উপস্থিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে জানিয়েছে এফএমটি। তবে তার বক্তব্যে বৈঠকটির উদ্দেশ্য ও আলোচনার বিষয়ে হাদির দাবির সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন ব্যাখ্যার ইঙ্গিত রয়েছে।

তাকিউদ্দীনের ভাষ্য, বৈঠকে দূতাবাসের প্রতিনিধিরা জানতে চেয়েছিলেন, পিএএস তৎকালীন বিএন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার কোনো পরিকল্পনা করছিল কি না। তিনি বলেন, পিএএস এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। কারণ দলটি মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ চায়নি।

তাকিউদ্দীন স্পষ্ট করে বলেন, মালয়েশিয়ার সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিদেশি হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল এমন সহায়তা চাইলে সেটি তাদের বিষয় হলেও পিএএস তা সমর্থন করে না।

হাদির সাম্প্রতিক বক্তব্যের মূল বার্তাও ছিল একই—মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিদেশি শক্তির ভূমিকা তারা গ্রহণ করতে চায় না। তার দাবি অনুযায়ী, প্রায় এক দশক আগে এমন একটি প্রস্তাব সামনে এলেও পিএএস তখন সেটি প্রত্যাখ্যান করেছিল।

২০১৪ সালের ওই ঘটনার দাবি সামনে আসায় মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব, বিরোধী জোটগুলোর কৌশল এবং ২০১৮ সালের ক্ষমতার পালাবদর নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে। তবে বৈঠকে ঠিক কী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং সেটির সঙ্গে পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

Tags :

মুরসালিন মাহমুদ তাইসিন | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।