নিখোঁজ শিশুর ঘটনায় জিডি নিতেও অনীহা পুলিশের

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশু নিখোঁজের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গিয়ে হয়রানি, অসহযোগিতা এবং পরবর্তী তদন্তে পুলিশের অনীহার অভিযোগ উঠেছে। নিখোঁজ শিশুদের স্বজনদের দাবি, সন্তান হারানোর পর পুলিশের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় তাদেরই বারবার থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে হচ্ছে। কোথাও জিডি নিতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে, আবার জিডি হওয়ার পরও শিশুকে উদ্ধারে যথেষ্ট তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

গত ৩০ আগস্ট রাজধানীর বনানী এলাকায় চার বছরের শিশু সাইবা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি এ অভিযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে। ওই দিন বিকেলে মা বিথী আক্তার মেয়েকে নিয়ে বনানী সৈনিক ক্লাবের সামনের ফুটওভার ব্রিজের কাছে যান। মেয়ের জন্য জুতা কিনতে গিয়ে তিনি কয়েক মিনিটের জন্য শিশুটিকে একটি জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখেন। ফিরে এসে দেখতে পান, সাইবা সেখানে নেই।

এরপর স্বজনেরা আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন এবং বনানী থানায় যান। পরিবারের অভিযোগ, নিখোঁজের দিন এবং পরদিন থানায় গিয়ে জিডি করতে চাইলেও তাদের অভিযোগ নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে জিডি গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দুই দিন পর সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

সাইবার নানী শরীফা বেগমের অভিযোগ, জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের বলেছিলেন, শিশু খুঁজে বের করা পুলিশের কাজ নয় এবং পরিবারের সদস্যরা নিজেরা খোঁজ করে তথ্য পেলে পুলিশকে জানালে তারা উদ্ধারের ব্যবস্থা করবে। এমন বক্তব্যের পর এক সপ্তাহ পার হলেও পুলিশের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি বা যোগাযোগ তারা পাননি বলে দাবি পরিবারের।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্যের কথা অস্বীকার না করে এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি গ্রহণের পাশাপাশি শিশুকে উদ্ধারের দায়িত্বও পুলিশের। কোনো কর্মকর্তা ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে অসহযোগিতা করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখার জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণিও বলেছেন, কোন থানায় কী ধরনের অসহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা গেলে তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ জন।

একই সময়ে শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনো নিখোঁজ। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এই বয়সসীমার ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হলেও ১ হাজার ৯৭০ জনের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।

শুধু সাইবার পরিবার নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকার আরও কয়েকটি পরিবার একই ধরনের অভিযোগ তুলেছে। খুলনার কয়রা থেকে নিখোঁজ সামিরার পরিবারও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গত বছরের ২৬ আগস্ট বাজার এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় শিশুটি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিখোঁজের আগে স্থানীয় এক যুবক তাকে ভ্যানে বসিয়ে মিষ্টি কিনে দিয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন। পরে পুলিশ ওই যুবককে থানায় নিয়ে গেলেও শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের অভিযোগ, জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ঢাকার মিরপুর-১১ এলাকা থেকে গত ১৩ মে নিখোঁজ হওয়া শিশু মোহাম্মদ ইব্রাহিমের পরিবারও পুলিশের বিরুদ্ধে জিডি নিতে দেরি করার অভিযোগ করেছে। তার বাবা মোহাম্মদ জসিমের দাবি, নিখোঁজের দুই দিন পর ১৫ মে জিডি নেওয়া হয়। পরে দীর্ঘদিন ঘোরানোর পর মামলার তদন্ত গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এখনো সন্তানের সন্ধান পাননি তিনি।

রাজবাড়ী থেকে ঢাকায় আসা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মো. নজরুল ইসলামের সন্তান তামিমও গত বছরের ২০ মে নিখোঁজ হয়। দীর্ঘ সময় ধরে খোঁজ করেও তিনি সন্তানের সন্ধান পাননি। নিজের সাবেক সহকর্মীদের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি। সন্তানকে খুঁজতে গিয়ে তাঁর ২৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলেও জানিয়েছেন।

৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সামাজিক সংগঠন মুন এলার্ট আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ শিশুদের স্বজনেরা এসব অভিযোগ তুলে ধরেন। সেখানে অন্তত ৩৫টি ভুক্তভোগী পরিবার উপস্থিত ছিল এবং দুই ডজনের বেশি স্বজন বক্তব্য দেন। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মুন এলার্টের তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির কার্যক্রম শুরুর পর থেকে তাদের কাছে শিশু নিখোঁজের ১ হাজার ২২৬টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে আট শতাধিক শিশুকে পুলিশের সহযোগিতায় উদ্ধার করা হয়েছে। সংগঠনটি ১৭১টি সতর্কবার্তা জারি করেছে, যার পর ১১৯ জন শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়কারী সাদাত রহমান বলেন, শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। তাঁর মতে, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারকে যাতে থানায় গিয়ে জিডি করার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক ঘণ্টা পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই অভিযোগ গ্রহণে বিলম্ব, দায়িত্ব পালনে সমন্বয়ের ঘাটতি কিংবা তদন্তে ধীরগতি নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। পুলিশের পক্ষ থেকেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।