রাজধানীর লালবাগে নিখোঁজের দুই দিন পর একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার পাশের মাটি খুঁড়ে শেখ ওয়াসিম রনি (৪৩) নামে এক ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পাওনা তিন লাখ টাকা ফেরত দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। এ ঘটনায় মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরী নামে একজনকে আটক করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে লালবাগের ৯ নম্বর বিসি দাস স্ট্রিটের একটি ভবনে অভিযান শুরু করে লালবাগ থানা পুলিশ। দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি ও মাটি খোঁড়ার কাজ চালানোর পর শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ভবনের নিচতলার পাশের মাটি থেকে ওয়াসিম রনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিহতের স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াসিম রনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে আটক মাসুম চৌধুরী ইমিটেশন জুয়েলারির ব্যবসা করতেন। যে ভবনের পাশ থেকে ওয়াসিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই ভবনের নিচতলায় মাসুমের একটি পাইকারি কারখানা ছিল।
মাসুমের দুলাভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আট মাস আগে ওয়াসিমের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নিয়েছিলেন মাসুম। ওই টাকার বিপরীতে প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। পরে মূল টাকা পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে ওয়াসিম ও মাসুমের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
তিনি জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে পাওনা টাকা চাইতে মাসুমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে যান ওয়াসিম। সেখানে টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় মাসুম ওয়াসিমের মাথায় ঘুষি মারেন বলে দাবি করেন তিনি। এতে ওয়াসিম অচেতন হয়ে পড়ে যান বলেও তার দাবি।
পরে ওয়াসিমকে ভবনের পাশের মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয় বলে পুলিশের কাছ থেকে জানতে পারেন বলে জানান মাসুমের দুলাভাই। তবে কীভাবে ওয়াসিমের মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্ত ও ময়নাতদন্তের আগে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
নিহতের স্ত্রীর ভাই মুরাদ হোসেন জানান, ৮ সেপ্টেম্বর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ওয়াসিমের যোগাযোগ হয়েছিল। ওই দিন তিন লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য একটি চেক দেওয়ার কথা ছিল বলেও তারা জানতে পারেন। কিন্তু দুপুরের পর থেকে ওয়াসিমের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এরপর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় তার খোঁজ শুরু করেন। ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে স্বজনেরা মাসুমের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তখন মাসুমের স্ত্রী ওয়াসিম সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে জানান। শুধু বলেন, ওয়াসিম বাসায় এসেছিলেন এবং পরে চলে গেছেন।
দীর্ঘ সময় কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে লালবাগ থানায় ওয়াসিম নিখোঁজের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ এমন তথ্য পায় যে, ওয়াসিমকে হত্যা করে একটি ভবনের নিচতলার পাশের মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মুরাদ হোসেনের অভিযোগ, ওয়াসিমের মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে আট বস্তা মাটি এনে ভবনের পাশে তাকে চাপা দেওয়া হয়েছিল। তার দাবি, হত্যার পর ওয়াসিমের হাত-পা বেঁধে মাটির নিচে রাখা হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
মুরাদ হোসেন বলেন, ‘আমার বোনের স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। এখন আমার বোন ও পরিবারের কী হবে, তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’
পুলিশ জানিয়েছে, ওয়াসিমের শরীরে কী ধরনের আঘাতের চিহ্ন ছিল, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—এসব ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আরও স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার পুরো বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান জানান, ৮ সেপ্টেম্বর ওয়াসিম রনি নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্বজনেরা থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিচতলার পাশের মাটির নিচ থেকে নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় মোহাম্মদ মাসুম চৌধুরীকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পেছনে প্রকৃত কারণ কী, এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না এবং ওয়াসিমের মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে এ ঘটনায় পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


