কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে চাহিদামতো সার না পেয়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ওপর হামলার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। ঘটনার পর এজাহারনামীয় দুই আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও অর্ধশত অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকা থাকায় পুরো এলাকা জুড়ে এখন চরম গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। হয়রানি থেকে বাঁচতে অনেক সাধারণ কৃষক রাতে নিজের বাড়ি ছেড়ে বাইরে রাত কাটাচ্ছেন।
গত ৭ সেপ্টেম্বর উপজেলার বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের ভূরুঙ্গামারী-সোনাহাট স্থলবন্দর সড়কের শহীদ মোড় এলাকায় এক সারের ডিলারের গুদামের সামনে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী সবাইকে পর্যাপ্ত সার দেওয়া হচ্ছিল না। সার পাওয়ার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সাধারণ কৃষকরা মাত্র ১০ কেজি করে সার পাচ্ছিলেন না। অন্যদিকে ডিলারের লোকজন স্বজনপ্রীতি করে টাকাওয়ালা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কয়েক বস্তা করে সার দিচ্ছিলেন। বারবার ঘুরেও সার না পেয়ে সাধারণ কৃষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা বাঁশ ফেলে ও কাঠ জ্বেলে ভূরুঙ্গামারী-সোনাহাট প্রধান সড়ক অবরোধ করেন। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস) ঘটনাস্থলে যান। তারা কৃষকদের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করার সময় ভিড়ের ভেতর থেকে কিছু অতিউৎসাহী ব্যক্তি কৃষি কর্মকর্তা ও বিএসের ওপর হামলা চালায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দুই কর্মকর্তা পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের রক্ষা করেন। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঘটনাস্থলে পৌঁছে মাইকে পর্যাপ্ত সার সরবরাহের আশ্বাস দিলে সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
এই হামলার ঘটনায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার বাদী হয়ে ভূরুঙ্গামারী থানায় ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৫০ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন মামলা ও দুই আসামিকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে মামলার এই পদক্ষেপে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ওই এলাকার মেহনতি কৃষকরা। ঘটনাস্থলে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় শতাধিক মানুষ উপস্থিত থাকায় এখন অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকায় নাম ওঠার ভয়ে সাধারণ কৃষকরা ঘরছাড়া। সারাদিন রোদে পুড়ে জমিতে কাজ করার পর রাতে গ্রেফতারের ভয়ে তাদের পালিয়ে থাকতে হচ্ছে অন্যত্র।
প্রত্যক্ষদর্শী কৃষক মোজাম্মেল হক ও রমজান আলী জানান, ডিলারের চরম স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের কারণেই সেদিন কৃষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। পরে কিছু সুবিধাবাদী মানুষ ভিড়ের সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে কৃষি কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ চালায়। যারা হামলা চালিয়েছে তাদের বিচার হোক, কিন্তু এখন পুলিশি অভিযানের ভয়ে নিরপরাধ কৃষকদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। অনেক কৃষকই পুলিশি হয়রানির আশঙ্কায় রাতে নিজেদের ঘরে ঘুমাতে পারছেন না।
কৃষকদের উদ্বেগ ও গ্রেফতার আতঙ্কের বিষয়ে ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিন জানান, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ওপর আক্রমণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলাটি নেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ও মোবাইল ভিডিও ফুটেজ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে কেবল প্রকৃত অপরাধীদেরই আইনি প্রক্রিয়ায় আনা হবে। কোনো নিরপরাধ কৃষক যেন বিন্দুমাত্র হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন সতর্ক রয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।


