কুমিল্লা অঞ্চলে রিকশাচালকদের ছদ্মবেশে ফুসলিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যা করা এবং পরবর্তীতে অটোরিকশা ছিনতাই করাই ছিল ‘সিরিয়াল কিলার’ আব্দুল ওয়াদুদ মানিকের মূল পেশা। অতি সম্প্রতি নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ উপজেলায় ঘটে যাওয়া পৃথক দুটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি এই মূল অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সংবাদকর্মীদের এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান।
ডিবি পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া এই কুখ্যাত অপরাধী আব্দুল ওয়াদুদ মানিক (২৫) মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথেরপেটুয়া ইউনিয়নের গনিপুর গ্রামের আমিনুল ইসলাম ওরফে দুলালের ছেলে।
পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট নাঙ্গলকোট থানার আটিয়াবাড়ি এলাকা থেকে এক তরুণ অটোরিকশাচালকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে লাশের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। নিহত ১৮ বছর বয়সী ওই চালকের নাম ছিল মো. মেহেদী। ঘটনাটি তদন্তে মাঠে নামে নাঙ্গলকোট থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার সাথে জড়িত আব্দুল ওয়াদুদ মানিকসহ তার সহযোগী শাহেদ, ফাহিম ও সেলিমকে আইনের আওতায় আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মানিক অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে মেহেদীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার কথা স্বীকার করেন এবং আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
এর কিছু দিন পরই, ২৪ আগস্ট নাঙ্গলকোটের অপর এক ১৫ বছর বয়সী কিশোর অটোরিকশাচালক মো. আরমান হোসেন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে পুনরায় তদন্ত শুরু করে ডিবি। একটি গ্যারেজ থেকে চোরাই ও খণ্ড-বিখণ্ড করা অটোরিকশার বডি উদ্ধারের পর গ্রেপ্তার করা হয় মো. জোবায়ের হোসেন সুজন, নূর আলম ও মো. গিয়াস উদ্দিন নামে তিনজনকে। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মানিককে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি আরমানকে শ্বাসরোধে হত্যার রোমহর্ষক বিবরণ দেন। পরবর্তীতে মানিকের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিনয়ঘর এলাকার একটি নিচু পুকুর থেকে নিখোঁজ আরমানের গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, দুটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পেছনেই ঘাতক চক্রটির একমাত্র লক্ষ্য ছিল অটোরিকশা ছিনতাই করে তা বিক্রি করা। এ ছাড়া মানিকের অপরাধ জীবনের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, তিনি একজন দুর্ধর্ষ ও পেশাদার সিরিয়াল অপরাধী। এর আগে ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর একইভাবে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে শাহজাহান ওরফে সাইমন (১৭) নামের এক কিশোরকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছিলেন এই মানিক। ওই পুরোনো হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত মামলাটি বর্তমানে বিজ্ঞ আদালতে বিচারপ্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, চক্রটির সাথে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে এবং এসব জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত চার্জশিট দাখিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


