১৪ ব্যাংকে ঋণ বিতরণে নিম্নমুখী প্রবণতা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিও কমেছে অথবা খুব সামান্য বেড়েছে। একই সময়ে শ্রেণিকৃত ঋণ দ্রুত বাড়ায় নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সতর্কতাও বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ছয় মাসে প্রায় ১৭ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা থেকে ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ পুরো ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি ছিল বেশ ধীর।

ব্যাংকভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই সময়ে অন্তত ১৪টি ব্যাংকের ঋণস্থিতি কমেছে অথবা উল্লেখযোগ্য কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি।

সবচেয়ে বেশি সংকোচন হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওতে। ছয় মাসে ব্যাংকটির বকেয়া ঋণ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বা ৯ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা কমেছে। ডিসেম্বরের ৯৫ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা থেকে জুনে সোনালী ব্যাংকের ঋণস্থিতি নেমে এসেছে ৮৫ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকায়।

এ সময়ে যমুনা ব্যাংকের ঋণ কমেছে ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং এনআরবিসি ব্যাংকের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। দেশের বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ঋণস্থিতিও ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমে ৪৪ হাজার ৮৮৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা থেকে ৪৩ হাজার ৫৬৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় নেমেছে।

ঋণ পোর্টফোলিও কমেছে ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকেরও। এসব ব্যাংকের ঋণ কমার হার যথাক্রমে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ, শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ, শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ, ১ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং ১ দশমিক ০২ শতাংশ।

একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যেও ঋণ বিতরণে দুর্বল প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জনতা ব্যাংকের ঋণস্থিতি ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং রূপালী ব্যাংকের ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়েছে।

কিছু ব্যাংকের প্রবৃদ্ধিতে সামগ্রিক চিত্র কিছুটা বদলেছে

সব ব্যাংকের ঋণ পরিস্থিতি অবশ্য একই রকম নয়। কিছু ব্যাংক তুলনামূলক দ্রুত ঋণ বাড়িয়েছে। কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি শতাংশ প্রবৃদ্ধি করেছে। ছয় মাসে ব্যাংকটির ঋণস্থিতি ৫০ দশমিক ১২ শতাংশ বেড়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ছোট ভিত্তির ওপর হয়েছে। ব্যাংকটির ঋণ ১ হাজার ৮৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

উত্তরা ব্যাংকের ঋণ বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং সিটিজেন্স ব্যাংকের ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

পরিমাণের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঋণ যোগ করেছে সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির ঋণস্থিতি ৪ হাজার ৮৬ কোটি টাকা বা ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে যে সামান্য ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার বড় অংশই এসেছে সীমিতসংখ্যক ব্যাংকের ঋণ সম্প্রসারণ থেকে।

দ্রুত বাড়ছে শ্রেণিকৃত ঋণ

ঋণ বিতরণে ধীরগতির পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সম্পদের মানের অবনতিও স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ছয় মাসে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

ফলে জুনে ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ শ্রেণিকৃত ঋণে পরিণত হয়েছে। ডিসেম্বরের হিসাবে এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

ঋণ সামান্য বাড়লেও সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ তুলনামূলক দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন ঋণ বিতরণ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিদ্যমান ঋণের মান, আদায়ের সক্ষমতা এবং ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক অবস্থার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্ক অবস্থান নিতে পারে—সামগ্রিক পরিসংখ্যানেও সেই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

বেসরকারি খাতে সামান্য ঋণ বৃদ্ধি

এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসের তথ্যেও ব্যাংক ঋণের ধীরগতির চিত্র উঠে এসেছে। ওই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ কমেছে।

অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ঋণপ্রবাহও ছিল অসম। এই প্রান্তিকে বাণিজ্যিক ঋণ ৪ শতাংশ বেড়েছে। তবে মেয়াদি ঋণ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ। কার্যকরী মূলধনের ঋণ শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ কমেছে। নির্মাণ খাতেও ঋণ কমেছে ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ।

এর অর্থ হলো, ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি কোনো বিস্তৃত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। কিছু খাতে ঋণ বাড়লেও ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের অর্থায়নে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।

সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বেড়েছে

ঋণ পোর্টফোলিও বাড়ানোর পরিবর্তে ব্যাংকগুলো সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মতো সরকারি উপকরণে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ছয় মাসে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়েছে।

ডিসেম্বরের ৬ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা থেকে জুনে এই বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ একই সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি যেখানে ২ শতাংশের কাছাকাছিও পৌঁছায়নি, সেখানে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ছিল অনেক বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর নেওয়া ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। ছয় মাসে এই ঋণ ২৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ প্রান্তিকের তথ্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ঋণ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি।

সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকিং খাতে অর্থের ব্যবহার বন্ধ হয়নি; বরং ঋণ বিতরণের পরিবর্তে অর্থের একটি বড় অংশ অন্য খাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। শ্রেণিকৃত ঋণের চাপ বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে এবং সরকারি সিকিউরিটিজের মতো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগে বেশি অর্থ রাখছে।

ব্যাংকিং খাতের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন ঋণ বাড়ানো নয়। বিদ্যমান সমস্যাগ্রস্ত ঋণ আদায়, সম্পদের মান ধরে রাখা, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। জুন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, ঋণ সম্প্রসারণের চেয়ে তারল্য ধরে রাখা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণই বর্তমানে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।