বিদগ্ধ প্রেমিক, রঙের জাদুকর ও আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার কিংবদন্তি
ক্যানভাসে যিনি রং-তুলির আঁচড়ে জীবনের গল্প লিখেছেন, রেখার বাঁকে আবিষ্কার করেছেন সৌন্দর্য, আর শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছেন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাণ ও মানুষের জীবন—তিনি মকবুল ফিদা হুসেন। আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে এক অনন্য নাম, যিনি তাঁর সৃষ্টিশীলতার শক্তিতে ভারতীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছেন।
মকবুল ফিদা হুসেন—শিল্পজগতের কাছে এম. এফ. হুসেন—ছিলেন এমন এক শিল্পী, যাঁর কাছে ক্যানভাস ছিল শুধু ছবি আঁকার পটভূমি নয়; ছিল জীবনকে অনুভব করার, সময়কে ধারণ করার এবং নিজেকে প্রকাশ করার এক অসীম পরিসর।
১৯১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ভারতের মহারাষ্ট্রের পন্ধরপুরে তাঁর জন্ম। শৈশবেই মাকে হারানোর বেদনা তাঁর জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে ইন্দোরে বেড়ে ওঠা এবং শিল্পের প্রতি ক্রমবর্ধমান আকর্ষণ তাঁকে নিয়ে যায় মুম্বাইয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার প্রচলিত পথ অনুসরণ না করেও নিজের অধ্যবসায়, নিরীক্ষা ও অসাধারণ প্রতিভায় তিনি গড়ে তোলেন স্বতন্ত্র শিল্পভাষা।
জীবনের শুরুতে জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি সিনেমার পোস্টার ও বিলবোর্ড আঁকতেন। বিশাল আকারের পোস্টারে দ্রুত, সাহসী ও প্রাণবন্ত রেখা টানার সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর চিত্রকলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নির্মাণে ভূমিকা রাখে। সাধারণ মানুষের জীবন, শহরের ব্যস্ততা, গ্রামবাংলার মতো ভারতীয় গ্রামীণ পরিসর, ঘোড়ার ছুটে চলা, পৌরাণিক আখ্যান—সবকিছুই তাঁর তুলিতে পেয়েছে এক নতুন মাত্রা।
১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বোম্বে প্রগ্রেসিভ আর্টিস্টস গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। এই গোষ্ঠীর শিল্পীরা ভারতীয় শিল্পকলাকে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও প্রচলিত রীতির গণ্ডি থেকে বের করে আধুনিকতার নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। হুসেনের চিত্রকলায় পাশ্চাত্য আধুনিকতার প্রভাবের সঙ্গে মিশে যায় ভারতীয় লোকশিল্প, পুরাণ, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির বহুমাত্রিক প্রকাশ।
তাঁর ছবিতে কখনো দেখা যায় মহাত্মা গান্ধী, মাদার তেরেসা কিংবা ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত-এর চরিত্র ও আখ্যান। কখনো উঠে আসে ভারতীয় শহর ও গ্রামের মানুষের জীবন, কখনো ছুটন্ত ঘোড়ার অবিন্যস্ত অথচ ছন্দময় গতি। তাঁর রং ছিল উজ্জ্বল, রেখা ছিল সাহসী, আর প্রকাশভঙ্গি ছিল স্বতন্ত্র। বাস্তবতাকে হুবহু অনুকরণ নয়, বরং অনুভূতি ও কল্পনার আলোয় নতুন করে নির্মাণ করাই ছিল তাঁর শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
শুধু চিত্রকলায় নয়, চলচ্চিত্রেও ছিল তাঁর সৃজনশীল পদচারণা। ১৯৬৭ সালে নির্মিত তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র Through the Eyes of a Painter বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে গোল্ডেন বিয়ার পুরস্কার অর্জন করে। চিত্রকলা ও চলচ্চিত্রের এই মেলবন্ধন তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভারই পরিচয় বহন করে।
শিল্পের প্রতি তাঁর ভালোবাসার পাশাপাশি সৌন্দর্যের প্রতিও ছিল গভীর অনুরাগ। বলিউড অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিতের অভিনয় ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি Hum Aapke Hain Koun..! চলচ্চিত্রটি বহুবার দেখেছিলেন বলে বহুল প্রচলিত রয়েছে। মাধুরীকে তিনি ভারতীয় নারীর সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখতেন। তাঁর এই অনুরাগ শিল্পীর ব্যক্তিগত রুচি, সৌন্দর্যবোধ ও কল্পনার জগতের এক মজার অধ্যায় হয়ে আছে।
হুসেনের জীবন অবশ্য বিতর্ক ও মতবিরোধের ঊর্ধ্বে ছিল না। তাঁর কিছু চিত্রকর্ম নিয়ে ভারতে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং আইনি জটিলতা ও হুমকির মুখে তিনি দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেন। ২০০৬ সালে তিনি কাতারে বসবাস শুরু করেন এবং ২০১০ সালে কাতারের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। শিল্পীর স্বাধীনতা, ধর্মীয় অনুভূতি ও মতপ্রকাশের সীমা নিয়ে তাঁর জীবন ও শিল্প আজও নানা আলোচনার বিষয়।
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ভারত সরকারের পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত হন। আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনেও অর্জন করেন বিশেষ মর্যাদা। তাঁর সৃষ্টিকর্ম বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘর, গ্যালারি ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে সংরক্ষিত রয়েছে।
২০১১ সালের ৯ জুন, ৯৫ বছর বয়সে, লন্ডনের একটি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।
মকবুল ফিদা হুসেনের জীবন ছিল রং, রেখা, কল্পনা, প্রেম, সাহস ও সৃষ্টিশীলতার এক বর্ণময় অভিযাত্রা। তাঁর তুলির প্রতিটি আঁচড় যেন বলে যায়—শিল্পের কোনো সীমানা নেই; শিল্পীর কল্পনা সময়, দেশ ও সংস্কৃতির গণ্ডি অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যেতে পারে।
শিল্পী চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর রং শুকিয়ে যায়নি। ক্যানভাসে, মানুষের স্মৃতিতে, শিল্পের ইতিহাসে তিনি আজও জীবন্ত—এক চিরচেনা অথচ চিরনতুন রঙের জাদুকর।
প্রয়াণ দিবসে এই মহান শিল্পীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণতি।


