সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতিতে রিয়াদ আঞ্চলিক ও পশ্চিমা বিভিন্ন অংশীদারের কাছ থেকে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা চাইছে। তবে বিষয়টিকে সরাসরি ‘তুরস্ক-পাকিস্তানের ওপর আস্থা নেই, ইসরায়েলেই ভরসা’—এভাবে ব্যাখ্যা করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামো গড়ে ওঠার পাশাপাশি সৌদি একাধিক দেশের কাছ থেকে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ সই হয়। চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এটি ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ধারণার সঙ্গে তুলনীয় হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে চুক্তিটির নিজস্ব কাঠামো ও শর্ত রয়েছে।
চুক্তি হয়েছে, তবে সামরিক কাঠামোও গড়ে উঠছে
চুক্তির পর তুরস্ক জানিয়েছিল, এর অধীনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তিন দেশের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভিন্ন সমন্বয় কাঠামো তৈরি করা হবে। স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর যৌথ মহড়া, আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে।
আগস্টের শেষ দিকে তিন দেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর জন্য সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হয়। প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য একজন পাকিস্তানি মহাসচিবের নেতৃত্বে এটি পরিচালিত হওয়ার কথা। অর্থাৎ, চুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কাজ এগোচ্ছে, কিন্তু পুরো যৌথ সামরিক ব্যবস্থা রাতারাতি কার্যকর হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেনি।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক ও পাকিস্তান—দুই দেশই প্রকাশ্যে বলেছে, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও বলেছেন, চুক্তিতে ইরান বা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। আক্রান্ত দেশ সহায়তা চাইলে পরিস্থিতি অনুযায়ী কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
ইয়েমেনে কেন পরিস্থিতি এত জটিল
সৌদি আরবের বর্তমান সংকটের কেন্দ্র ইয়েমেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-সমর্থিত হুথিরা ইয়েমেনে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে এবং সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর অবস্থান দুর্বল হয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রভাব বাড়িয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তার পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে শুধু স্থলযুদ্ধের প্রশ্ন নেই। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা, সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখা এবং প্রতিপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। এ কারণে রিয়াদ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরসহ বিভিন্ন দেশের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো দেশ সরাসরি বড় ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—এমন তথ্যও প্রকাশিত হয়নি।
তাহলে ইসরায়েলের প্রসঙ্গ কোথা থেকে এলো?
সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের নিরাপত্তা সহযোগিতার খবর স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের কাছ থেকে নির্দিষ্ট গোয়েন্দা সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত সরকারি ঘোষণা পাওয়া যাচ্ছে না। বরং ১৫ সেপ্টেম্বর জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আট আরব দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের একটি গোপন বৈঠকের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ওই বৈঠকে সৌদি আরবও অংশ নেয় বলে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে। বৈঠকটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ইরানকে ঘিরে সামরিক সমন্বয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সৌদি আরবের যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। ইয়েমেন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সরাসরি সৌদি সামরিক অভিযানে যোগ না দিলেও গোয়েন্দা সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
তাই ‘সৌদি ইসরায়েলকেই ভরসা করছে’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার চেয়ে বলা যায়, রিয়াদ বর্তমানে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক নিরাপত্তা অংশীদারের সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইসরায়েলের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে যোগাযোগ থাকলেও সেটিকে মক্কা চুক্তির বিকল্প হিসেবে দেখানোর মতো তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
পাকিস্তানের অবস্থান কী
মক্কা চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী পাকিস্তান বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে। একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ইয়েমেন সংকটে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পাকিস্তানকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং নিজস্ব সামরিক সক্ষমতার বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সৌদি-হুথি উত্তেজনার মধ্যে সৌদি সীমান্তের কাছে সেনা মোতায়েন করেছে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামাবাদ হুথিদের ওপর ইরানের প্রভাব কাজে লাগিয়ে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টাও করছে। অর্থাৎ পাকিস্তানের ভূমিকা কেবল সামরিক নয়; কূটনৈতিকও।
এ কারণেই মক্কা চুক্তির ‘এক দেশের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’ ধারাটি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই অন্য দুই দেশকে একই মাত্রায় সামরিক অভিযান চালাতে হবে—চুক্তির প্রকাশিত তথ্য থেকে এমন সরল সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
তুরস্ক কেন সরাসরি যুদ্ধে নেই?
তুরস্কও মক্কা চুক্তিকে মূলত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করেছে। যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উচ্চপর্যায়ের সমন্বয়—এসবই চুক্তির ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে।
সুতরাং সৌদি আরবের বর্তমান ইয়েমেন সংকটের সমাধান হিসেবে তুরস্ককে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতেই হবে—এমন কোনো প্রকাশ্য ব্যবস্থা চুক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা যায়নি। বরং তিন দেশ এখন চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করছে।
চুক্তিটি কি তাহলে ব্যর্থ?
এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো সময় হয়নি। ৭ আগস্ট চুক্তি স্বাক্ষরের পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে তিন দেশ চুক্তির সচিবালয় ও সমন্বয় কাঠামো গড়ে তুলছে। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জোটে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।
তবে বর্তমান ইয়েমেন সংকট একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে। রাজনৈতিকভাবে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করা এবং যুদ্ধের সময় তা দ্রুত সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তর করা এক বিষয় নয়।
সৌদি আরব এখন একই সঙ্গে কয়েকটি পথে এগোচ্ছে—নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ব্যবহার, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অংশীদারদের সহায়তা চাওয়া, পাকিস্তান ও মিসরের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং বৃহত্তর আরব-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা সমন্বয়ে অংশ নেওয়া।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘তুরস্ক-পাকিস্তানে আস্থা নেই, ইসরায়েলেই ভরসা’—এই এক লাইনের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। বাস্তবতা হলো, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এখনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার পর্যায়ে, আর একই সময়ে সৌদি আরব এমন একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়েছে, যেখানে তাৎক্ষণিক প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং কূটনৈতিক সহায়তা—সবই প্রয়োজন হচ্ছে।
এই সংকট শেষ পর্যন্ত মক্কা চুক্তির বাস্তব সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই পরীক্ষার ফলাফল এখনই নির্ধারিত হয়েছে—এমন দাবি করার সময় আসেনি।


